Logo

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মচারীর শতকোটি টাকার সম্পদ

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মচারীর শতকোটি টাকার সম্পদ

উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর সড়কে পাশাপাশি দুটি ছয়তলা বাড়ি। নম্বর ৪৭ ও ৬২। আরও একটি বহুতল বাড়ির নির্মাণ চলছে পাশের ৪৯ নম্বর প্লটে। কাছাকাছি আরও একটি বহুতল বাড়ি আছে, যার নম্বর ৬৬।

বাড়িগুলোকে ঘিরে হঠাৎ করে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা দুদক তৎপর হয়ে উঠেছে। এগুলোর মালিক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চতুর্থ শ্রেণির একজন কর্মচারী জানার পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে সংস্থাটিতে।

দুদকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই বাড়িগুলোর মালিক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মেডিকেল এডুকেশন শাখার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আবজাল হোসেন ও তার স্ত্রী রুবিনা খানম।

এই সেক্টরের ১৬ নম্বর সড়কের ১৬ নম্বর বাড়ি। এটিও ছয়তলার। এর মালিকও একই দম্পতি। দুদক বলছে, তাদের আরও সম্পদ আছে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা, ফরিদপুর শহরে এমনকি অস্ট্রেলিয়ায়। আর এর সব তথ্য-প্রমাণও আছে তাদের হাতে।

তবে বাড়ির তত্ত্বাবধানে যাদের রেখেছেন এই দম্পতি, তাদের বেশির ভাগের কাছে নিজেদের পরিচয় গোপন করেছেন তারা। কেবল একটি বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক জানাতে পেরেছেন বাড়ির মালিক রুবিনা। তবে তিনি পোশাক ব্যবসায়ী।

১৩ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর সড়কের ৪৯ নম্বর প্লটটিতে দুই দিন আগে নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। সেখানে গিয়ে পাওয়া গেল নিরাপত্তাকর্মী উপেন্দ্রনাথ দাসকে। মালিক কে জানতে চাইলে বলেন, ‘মালেক সাহেব নামের একজন ইঞ্জিনিয়ার। নর্থবেঙ্গল ডেভেলপার্স লিমিটেড নামের একটি কোম্পানি প্লটের নির্মাণকাজের দায়িত্ব পেয়েছেন। এর বেশি কিছু জানি না।’

৪৭ নম্বর বাড়ির নামফলকে বড় করে লেখা রয়েছে ‘তামান্না ভিলা’। বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক মামুন শিকদার দুই বছর ধরে সেখানে কাজ করেন। মালিক কে  জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মালিক গার্মেন্টস ব্যবসায়ী রুবিনা খানম।’

বাড়িটির ঠিক উল্টো দিকে ৬২ নম্বর বাড়ির নামফলকে ইংরেজিতে লেখা Amical Kamal Castle. সেখানে পাঁচ বছর ধরে নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে কাজ করেন আনিসুল ইসলাম। বলেন, ওই বাড়ির মালিক যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী মোস্তফা কামাল।

১৬ নম্বর সড়কের ১৬ নম্বর বাড়িটি ছয়তলার। নিরাপত্তারক্ষী আমির হোসেন জানান, তিনি তিন দিন আগে নিয়োগ পেয়েছেন। বাড়ির মালিকের নাম আমজাদ হোসেন ছাড়া আর কোনো তথ্য জানেন না।

দুদক জানাচ্ছে, আবজাল হোসেনের স্ত্রী রুবিনা খানমও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন শাখায় স্টেনোগ্রাফার হিসেবে চাকরি করতেন। তবে বিপুল বিত্তবৈভব হওয়ার পর চাকরি ছেড়ে ব্যবসা করছেন। প্রচার আছে পোশাকশিল্প গড়েছেন।

এই দম্পতির সম্পদের তথ্য পেয়ে গতকাল আবজালকে দুদকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার স্ত্রীকেও ডাকার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

দুদকের সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে আবজাল জানিয়েছেন, স্ত্রীর নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও লাইসেন্স তৈরি করে টেন্ডার-বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন তিনি। প্রতিবছরই বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের জন্য শতকোটি টাকার কেনাকাটা হয়। হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হওয়ায় তার পক্ষে টেন্ডার-বাণিজ্য করা কঠিন কিছু ছিল না। ২০ বছর ধরে এই কাজ করে বিপুল সম্পদ গড়েছেন তিনি। যে তথ্য আছে তাতে এই সম্পদ ১০০ কোটি টাকারও বেশি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গেও আবজালের যোগসাজশের তথ্য মিলেছে। কার কার সঙ্গে যোগাযোগ করে তিনি টাকা কামিয়েছেন, সেটাই অনুসন্ধানের চেষ্টা চলছে এখন।

দুদক জানতে পেরেছে, আবজাল হোসেন গত এক বছরে অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে ২৮ বারেরও বেশি সময় সফর করেছেন। সফরের যে ব্যয় হয়েছে, সেই অর্থ কোথায় পেয়েছেন তা নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেও রয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা।

এর আগে অবৈধ সম্পদ অর্জন, দেশ-বিদেশে অর্থ পাচার, টেন্ডারবাজিসহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ মিলেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন ও আবদুর রশীদ, সহকারী পরিচালক আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে। তাদেরও দুদকে তলব করা হয়েছে। আগামী ১৪ জানুয়ারি তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

এই দম্পতির সম্পদের অনুসন্ধান করছেন দুদকের উপপরিচালক সামছুল আলম। গতকাল সকাল ১০টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত আবজালকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। তবে কী জবাব মিলেছে, সেটি এখনো বলতে চান না। বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদ করেছি, তিনি কিছু জবাব দিয়েছেন। সামনে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’

এ বিষয়ে আবজালের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তিনি কিছু বলতে রাজি হননি।

দুদকের এই কর্মকর্তা জানান, আবজাল ও তার স্ত্রীর বিদেশে যাওয়া রোধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তাদের নজরদারিতে রাখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

দুদক জানায়, এই দম্পতির বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির বিষয়ে তাদের কাছে তথ্য আসার পর সংস্থাটির একটি তদন্ত দল প্রাথমিক অনুসন্ধান চালায়। সেখানে অভিযোগের সত্যতা মেলার পর নিয়মিত তদন্তের সিদ্ধান্ত হয়। এই তদন্ত শেষ করে হবে মামলা।

এই দম্পতি যেন বিদেশে পালিয়ে যেতে না পারেন, সেই ব্যবস্থাও নিয়েছে দুদক। দুদকের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা পুলিশের বিশেষ শাখায় আবেদন করলে বিশেষ পুলিশ সুপার (ইমিগ্রেশন) এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেন।

গত সোমবার পুলিশের বিশেষ শাখার বিশেষ পুলিশ সুপার (ইমিগ্রেশন) বরাবর বিদেশ যেতে বাধা দিতে চিঠি দেওয়া হয়েছে।