Logo

স্থবির রাজউক, অসহায় চেয়ারম্যান

স্থবির রাজউক, অসহায় চেয়ারম্যান

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কর্মকাণ্ডে হঠাৎ দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা খোদ চেয়ারম্যানের নির্দেশনাই মানছেন না বলে তথ্য পাওয়া গেছে। সংস্থার প্রধান এই স্থবিরতার কথা স্বীকার করে জানিয়েছেন, আর এভাবে চলতে দিতে চান না তিনি। এবার তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজের তদারকি ও গতি আনতে নিয়মিত মাসিক সমন্বয় সভা করে আসছে রাজউক। সভায় বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে করণীয় নির্ধারণের নির্দেশনা দিয়ে থাকেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান। এ নির্দেশনা মেনে কাজ করার কথা সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর। অথচ বিগত কয়েক মাসে সংস্থাপ্রধানের বেশ কিছু নির্দেশনা উপেক্ষিত হয়েছে। এ নিয়ে পরবর্তী সমন্বয় সভাগুলোতে বারবার তাগিদ দিয়ে পুনর্নির্দেশনা দেওয়া হলেও তা অবহেলিতই রয়ে যায়। সম্প্রতি রাজউকের বেশ কয়েকটি সমন্বয় সভার কার্যবিবরণী পর্যালোচনা করে পাওয়া গেছে এই তথ্য।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গে  বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য, সংস্থার প্রধানের নির্দেশনাই এখানে মানা হয় না। যে সংস্থার ভেতরেই এমন বেহাল দশা, তা গ্রাহকদের কীভাবে উন্নত সেবা দেবে, সে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।’

এ বিষয়ে রাজউকের সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় প্রধানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে নানা অজুহাত দেখিয়েছেন তারা। রাজউকের জনবল সংকটকেও এ জন্য দায়ী করেছেন অনেকে।

এ বাস্তবতা স্বীকার করে রাজউকের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান  বলেন, ‘রাজউকের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছি। কিন্তু সবার সহযোগিতা না পাওয়ায় যেভাবে চাচ্ছি, সেভাবে কাজ করতে পারছি না। এভাবে চলতে পারে না। সবার সহযোগিতা না পেলে একা সব ঠিক করা সম্ভব নয়।’

জনবল সংকটের অজুহাত প্রসঙ্গে রাজউকের প্রধান বলেন, ‘এটা কোনো এক্সকিউজের মধ্যে পড়ে না। কাজ না করলে চেয়ার হোল্ড করার তো কারণ নেই। কাজ করতে হবে, নয়তো চেয়ার ছেড়ে দিতে হবে।’ ভবিষ্যতে খামখেয়ালিপনা ও নির্দেশনা না মানার বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন রাজউক চেয়ারম্যান।

রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম  বলেন, ‘আঞ্চলিক অফিসগুলো থেকে অপসারণ ও উচ্ছেদের বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য চাওয়া হয়েছে। তারা তথ্য সরবরাহ করতে না পারায় প্রতিবেদন দাখিলে দেরি হচ্ছে।’

যথাসময়ে কাজ না হওয়ার জন্য জনবল সংকটকেও দায়ী করেন এই কর্মকর্তা। রাজউকের সভার কার্যবিবরণীতে দেখা যায়, নগর পরিকল্পনার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গেল বছরের জুলাইয়ে রাজধানীতে অবৈধভাবে ভরাট করা জমিগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করে সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) বরাবর সংশ্লিষ্ট জোনাল পরিচালকদের প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর একের পর এক সমন্বয় সভা হলেও এ নির্দেশের কোনো বাস্তবায়ন হয়নি। গত অক্টোবরের মাসিক সমন্বয় সভায় এ নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতির বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।’ বছর শেষেও এ অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি।

একই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে অবৈধ ও অননুমোদিত বেসরকারি আবাসিক প্রকল্পের সাইনবোর্ড অপসারণ/উচ্ছেদ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের হালনাগাদ সুনির্দিষ্ট তথ্যাদির প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয় সংস্থার প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদকে। পাশাপাশি রাজধানীর বাড্ডায় রাজউকের কোয়ার্টারের জন্য নির্ধারিত স্থান জরিপ করে রাস্তা, ড্রেনেজ-ব্যবস্থা, সীমানা নির্ধারণ, নিরাপত্তাসহ সার্বিক বিষয়ে প্রস্তাবনা ও সুপারিশসহ একটি প্রতিবেদন ১৫ নভেম্বরের মধ্যে দাখিলের নির্দেশনা দেওয়া হয় প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদকে। এখন পর্যন্ত দুটি প্রতিবেদনের একটিও জমা পড়েনি চেয়ারম্যানের দপ্তরে।

রাজউক ভবনের ভাড়াটিয়াদের বিষয়ে দুটি নির্দেশনা দিয়েছিলেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান। দুটি নির্দেশনার একটিও বাস্তবায়িত হয়নি। ভবনের ভাড়াটিয়া পটুয়াখালী জুট মিলস লিমিটেডের সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে পত্র যোগাযোগের মাধ্যমে রাজউকের ভাড়া করা জায়গা খালি করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। পাশাপাশি তা বাস্তবায়নের অগ্রগতির বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর (দক্ষিণ ঢাকা) দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। এ বিষয়েও কোনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। জরুরি ভিত্তিতে এ-সংক্রান্ত কমিটির আহ্বায়ককে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হলে সে নির্দেশনাও বাস্তবায়িত হয়নি এখনো। এ বিষয়েও কোনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।

ই-সেবা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্পট কোটেশনের মাধ্যমে উপপরিচালকের (অর্থ) সহায়তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট জোনাল পরিচালকদের কম্পিউটার কেনার নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু তাও বাস্তবায়িত হয়নি।

বিবিধ আলোচ্যসূচিতে আরও কিছু নির্দেশনা অগ্রাহ্য করার চিত্র দেখা গেছে। যেমন বিবিধ সিদ্ধান্ত-১ এ বলা আছে, বিভিন্ন ব্যক্তি/সংস্থার অনুকূলে বরাদ্দকৃত প্লট/ফ্ল্যাটের বরাদ্দপত্র ইস্যু করার সময় বরাদ্দপত্রে এবং সম্পাদেয় দলিলের তফসিলে সিএস, আরএস, বিএস, এসএ খতিয়ান ও দাগ নম্বর, সিটি জরিপ, মাঠ জরিপ, মৌজা ইত্যাদিসহ প্রয়োজনীয় তথ্যাদি বরাদ্দপত্রে উল্লেখ করার জন্য প্রকল্প পরিচালকেরা তা জরুরি ভিত্তিতে পরিচালককে (এস্টেট ও ভূমি-১/২) সরবরাহ করবেন। এ নির্দেশনারও কোনো অগ্রগতি প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। এ রকম আরও অনেক কাজের নির্দেশনাসহ সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি।