Logo

সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার নিয়ে কারসাজি!

সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার নিয়ে কারসাজি!

হঠাৎ পুঁজিবাজারে ‘আলাদিনের চেরাগ’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স। দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বেড়ে চারগুণ ছাড়িয়েছে। একটি বিশেষ চক্র কারসাজির মাধ্যমে সাধারণ বীমা কোম্পানিটির শেয়ারের দাম এমন অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পুঁজিবাজারে গুঞ্জন রয়েছে, শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ানোর লক্ষ্যে সম্প্রতি এক বিনিয়োগকারী সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের এক শীর্ষ ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বিনিয়োগকারীর নামের প্রথম অক্ষর ‘এস’। বৈঠকে ‘এস’ আদ্যাক্ষরের বিনিয়োগকারী শেয়ারের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিলে সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের শীর্ষ ওই কর্তা বলেন, ‘যত খুশি দাম বাড়াও, আমার কোনো আপত্তি নেই।’

যে বিনিয়োগকারী সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়াতে প্রধান ভূমিকা রেখেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে, ওই বিনিয়োগকারীকে সম্প্রতি পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) জরিমানা করেছে।

সাতটি কোম্পানির শেয়ারের কারসাজির মাধ্যমে অস্বাভাবিক দাম বাড়ানোর অপরাধে ওই জরিমানা করা হয়।

মুন্নু জুট স্টাফলারস্, মুন্নু সিরামিক, লিগাসি ফুটওয়্যার, বাংলাদেশ অটোকার, কুইন সাউথ টেক্সটাইল, আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ ও ইস্টার্ন লুব্রিকেন্টস’র শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে ওই বিনিয়োগকারী বাজার অস্থিতিশীল করেন বলে বিএসইসির তদন্তে উঠে আসে।

ডিএসইর এক সদস্য বলেন, যে কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের নিয়মিত লভ্যাংশ দেয়ার সক্ষমতা নেই এবং দুই বছরের মধ্যে শেয়ারের দাম ২০ টাকার ঘর অতিক্রম করতে পারেনি, সেই কোম্পানির শেয়ারের দাম ৬৩ টাকা হওয়া কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারে না। হঠাৎ করে কী এমন ঘটলো যে শেয়ারের দাম এমন অস্বাভাবিক হারে বাড়বে! এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো কারসাজি চক্র আছে। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি বছরের শুরু থেকে সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম কার্যদিবস অর্থাৎ ১ জানুয়ারি কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ছিল ১৫ টাকা ৩০ পয়সা। যা টানা বেড়ে সোমবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) লেনদেন শেষে দাঁড়িয়েছে ৬৩ টাকা। অর্থাৎ দুই মাসেরও কম সময়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিটি শেয়ারের দাম বেড়েছে ৪৭ টাকা ৭০ পয়সা।

অন্যভাবে বললে, কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ১১ গুণ। এ হিসাবে ১ জানুয়ারি যে বিনিয়োগকারীর কাছে সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের ১০ লাখ টাকার শেয়ার ছিল, তিনি যদি ওই শেয়ার ধরে রাখেন তাহলে সেই শেয়ারের দাম এখন ৪১ লাখ ১৭ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ১০ লাখ টাকা দুই মাসের কম সময় খাটিয়ে লাভ পাওয়া যাচ্ছে ৩১ লাখ ১৭ হাজার টাকা।

সম্প্রতি এমন অস্বাভাবিক হারে দাম বাড়লেও গত দুই বছরে কখনও কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ২৩ টাকায় পৌঁছায়নি। চলতি বছর বাদ দিলে সাধারণ বীমা কোম্পানিটির শেয়ারের দাম সর্বোচ্চ ছিল ২০১৭ সালের ৮ অক্টোবর। ওইদিন কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ২২ টাকা ৯০ পয়সা। তবে ২০১৭ সালের নভেম্বরের শুরুতে শেয়ারের দাম কমে ২০ টাকার নিচে চলে আসে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ারের দাম আর কখনও ২০ টাকার ঘরে পৌঁছাতে পারেনি।

সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্বে আছেন শেখ কবির হোসেন। তিনি বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ)-এর সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন প্রায় এক দশক ধরে। ২০১৫ সালের মার্চ থেকে সেন্ট্রাল ডিপজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড’র (সিডিবিএল) চেয়ারম্যান পদেও আছেন তিনি।

সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারের দাম বাড়ার প্রবণতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি  বলেন, ‘বুঝতে পারছি না, এটা নিয়ে আমিও মাঝেমধ্যে চিন্তা করি, দাম এত বাড়ছে কেন? কারণটা কী? আমাদের শেয়ারের মধ্যে ওই রকম কিছু তারা পাইছে কি-না, যার জন্য ওরা কেনাকাটা করছে। হয়তো আস্থা পাচ্ছে, এজন্য নাকি, আল্লাহ্-ই জানেন!’

সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারের দাম ৬৩ টাকা হওয়া যুক্তিসংগত কিনা- এমন প্রশ্ন করা হলে সিডিবিএল’র চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করা শেখ কবির হোসেন বলেন, ‘যুক্তিসংগত না হলে দাম বাড়বে কেন, আমি তো এটাই মনে করি। শুধু সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স নয়, অনেক ইন্স্যুরেন্সের দাম বাড়ছে। পুঁজিবাজরের সঙ্গে যারা আছেন তারা হয়তো ইন্স্যুরেন্স খাতের দিকে একটু নজর দিয়েছেন, এজন্য দাম বাড়ছে।’

তবে গত ১৫ জানুয়ারি ডিএসই থেকে বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে এক বার্তায় জানানো হয়, সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক বাড়ার কারণ জানতে নোটিস পাঠানো হয়। নোটিসের জবাবে বীমা কোম্পানিটির কর্তৃপক্ষ জানায়, সম্প্রতি শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক বাড়ার পেছনে অপ্রকাশিত কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই। সে সময় কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ছিল ২৩ টাকা ৩০ পয়সা। ডিএসইর ওই সতর্কবার্তা প্রকাশের পর কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। তবে এরপর সোমবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত ডিএসই থেকে আর কোনো সতর্কবার্তা প্রকাশ করা হয়নি।

যোগাযোগ করা হলে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সাইফুর রহমান  বলেন, ‘যে কোম্পানির শেয়ারের দাম অতিরিক্ত বাড়ে, আমরা সার্ভিলেন্সের মাধ্যমে এর নজদারি করি এবং প্রয়োজন হলে বিশ্লেষণ করে তদন্ত করি। সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের বিষয়টি আমাদের ওয়ার্ক লিস্টের মধ্যে আছে। তবে এখনও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি।’

২০১৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ৩৭ কোটি ৭৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। কোম্পানিটির মোট শেয়ারের সংখ্যা তিন কোটি ৭৭ লাখ ৭৪ হাজার ৯৫০টি। প্রতিটি শেয়ারের ফেস ভ্যালু ১০ টাকা।

প্রতিষ্ঠানটির মোট শেয়ারের মধ্যে ৩১ দশমিক ৭৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে। বাকি শেয়ারের মধ্যে ৪৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ রয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে আছে ২৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ শেয়ার।

২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত গত নয় বছরে কোম্পানিটি মাত্র দু’বার শেয়ারহোল্ডারদের নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। এর মধ্যে ২০১৫ সালে পাঁচ শতাংশ এবং ২০১৪ সালে ছয় শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেয় প্রতিষ্ঠানটি। তবে বোনাস শেয়ারের মাধ্যমে প্রতি বছর ১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ দিয়ে সাধারণ বীমা কোম্পানিটি ‘এ’ গ্রুপের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।