Logo

শুল্ক বাধায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান

শুল্ক বাধায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান

বৈধ ও অবৈধ মিলিয়ে মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশীর সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী এ ভোক্তাশ্রেণীকে লক্ষ্য করে ২০১০ সাল থেকে দেশটিতে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রফতানি করে আসছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। তবে বাংলাদেশে প্রস্তুত বিভিন্ন ফ্রুট ড্রিংক ও বেভারেজ পণ্য দেশটির বাজারে ৩০ শতাংশ শুল্কের মুখোমুখি হয়। যেখানে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনামের মতো আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো থেকে যাওয়া ফ্রুট ড্রিংক ও বেভারেজ পণ্যগুলোয় শূন্য শুল্ক প্রযোজ্য। এর পরিপ্রেক্ষিতে মূল্যযুদ্ধে শুরুতেই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন বাংলাদেশী রফতানিকারকরা।

ছোট-বড় মিলিয়ে বাংলাদেশে প্রায় ২০টি ব্যাটারি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ খাতের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান রহিমআফরোজ। কয়েক বছর ধরে গাড়ি ও মোটরসাইকেলে ব্যবহূত অটোমেটিভ ব্যাটারি মালয়েশিয়ায় রফতানি করছে প্রতিষ্ঠানটি। মালয়েশিয়ার বাজারে ব্যাটারি রফতানি ২৫ শতাংশ হারে শুল্ক ও সেলস অ্যান্ড সার্ভিস ট্যাক্স (এসএসটি) হিসেবে আরো ১০ শতাংশ শুল্কের মুখে পড়ে। যেখানে চীন ও ভারত থেকে আসা ব্যাটারি মালয়েশিয়ার বাজারে ঢুকছে শূন্য শতাংশ শুল্কে। এক্ষেত্রেও মূল্যযুদ্ধে হেরে যাচ্ছে বাংলাদেশী পণ্যটি।

রহিমআফরোজ গ্রুপের হেড অব করপোরেট শহিদুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, মালয়েশিয়ায় গাড়ির ব্যাটারির বাজারে মানের দিক থেকে ভালো অবস্থানে রয়েছে রহিমআফরোজ। ২৫ শতাংশ শুল্ক পরিশোধের পরও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রায় দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রায় দশমিক ৮৫ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করেছে তারা। যেখানে চীন ও ভারত থেকে যাওয়া ব্যাটারির জন্য কোনো শুল্ক পরিশোধ করতে হচ্ছে না। শুল্ক বাধার পাশাপাশি গত অর্থবছরে হঠাৎ করেই ১০ শতাংশ এসএসটি আরোপ করে মালয়েশিয়া সরকার। এর প্রভাবে ব্যাটারির দাম বেড়ে যায় এবং ব্যবসা হারায় রহিমআফরোজ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মাত্র ৫২ হাজার ডলারের পণ্য রফতানি করতে পেরেছে প্রতিষ্ঠানটি।

তিনি বলেন, শুল্ক বাধার বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করেছি। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসও বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী।

জানা গেছে, মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের কৃষিজাত পণ্য, চিংড়ি, কাঁকড়া, পাট ও পাটজাত পণ্য, মসলা, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, আলু, শাক-সবজি, সিরামিক টেবিলওয়্যার, হিমায়িত মাছ, তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার, টেক্সটাইল ও হালাল খাদ্যপণ্য রফতানি হচ্ছে। প্রবাসী বাংলাদেশীদের কারণে প্রাণ ও স্কয়ার গ্রুপের ভোগ্যপণ্যের চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বণিক বার্তাকে বলেন, প্রাণের খাদ্যপণ্যের বিশাল চাহিদা রয়েছে মালয়েশিয়ায়। বিস্কুট, চানাচুর, মসলা, বিভিন্ন ফলের জুস প্রক্রিয়া করে আমাদের প্রতিষ্ঠান রফতানি করে। প্রতি বছরই প্রায় ২০ শতাংশ হারে পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। তবে শুল্ক বাধার কারণে আসিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে।

তিনি বলেন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি ও দুই দেশের বাণিজ্যে ভারসাম্য আনতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্টের (এফটিএ) বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে এর আগেই সরকারের পক্ষ থেকে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সম্ভাবনাময় রফতানি পণ্যের শুল্ক বাধা দূর করা সম্ভব হলে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অন্য দেশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম হবে।

উল্লেখ্য, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি ও দুই দেশের বাণিজ্যে ভারসাম্য আনতে বাংলাদেশকে এফটিএর জন্য ২০১২ সালে প্রস্তাব দিয়েছিল মালয়েশিয়া। দীর্ঘ এ সময়েও দেশটির সঙ্গে এফটিএতে লাভ-ক্ষতির হিসাব চূড়ান্ত করতে পারেনি বাংলাদেশ।

এর আগে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মালয়েশিয়া সফরের সময়েও দেশটির তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক এফটিএ সইয়ের আহ্বান জানান। সে সময় এফটিএর বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে মালয়েশিয়ার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও শিল্পবিষয়ক মন্ত্রী দাতো মুস্তফা মোহাম্মদ বাংলাদেশ সফরের সময়ও এফটিএ স্বাক্ষরের জন্য বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদকে প্রস্তাব দেন। মালয়েশিয়ার সঙ্গে এফটিএ হলে বাংলাদেশের কী লাভ-ক্ষতি হতে পারে, সে হিসাব কষছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিএমসিসিআই) সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশী ৩৩০টি পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা দিচ্ছে। কিন্তু এটা আসলে কাজে আসছে না। 

কারণ এর অধিকাংশ পণ্যই আমরা উৎপাদন করি না। বাংলাদেশ থেকে সিরামিক পণ্য রফতানি হয়। যেটির ওপর ৩০ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। পোশাক পণ্যের মধ্যে বেশি যাচ্ছে টি-শার্ট ও শার্ট। এটিও শুল্কমুক্ত নয়। একইভাবে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রফতানি করছে প্রাণ ও স্কয়ার। যারা আবার আশিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে ওইসব দেশ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। ভারত ও চীনের সঙ্গে মালয়েশিয়ার এফটিএ রয়েছে। সে কারণে ওইসব দেশের পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাচ্ছে। মালয়েশিয়া এফটিএর জন্য ২০১০ সালে বাংলাদেশকে প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু এফটিএ করলে লাভ না লোকসান সে বিষয়ে এত বছরেও সিদ্ধান্ত নেয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, মালয়েশিয়া বর্তমানে ৩৩০টি পণ্যে বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিচ্ছে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ঘাটতিতে রয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশের আমদানির পরিমাণ ২০৮ কোটি ৪১ লাখ ডলার, যেখানে বাংলাদেশ রফতানি করেছে মাত্র ১৩ কোটি ৫৬ লাখ ডলার। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মালয়েশিয়া থেকে আমদানির পরিমাণ ১২৯ কোটি ৯৪ লাখ ও রফতানি ১৪ কোটি ১ লাখ ডলার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ৯৫ কোটি ৬৭ লাখ ও রফতানি ১৯ কোটি ১০ লাখ ডলার। আর গত অর্থবছরে (২০১৭-১৮) আমদানির পরিমাণ ১৪১ কোটি ৪ লাখ ও রফতানি দাঁড়ায় ২৩ কোটি ২৪ লাখ ডলারে।

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রথম সচিব (বাণিজ্যিক) রাজিবুল আহসান এ প্রসঙ্গে বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যেই আমরা মালয়েশিয়ার বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করছি। বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সেরা গন্তব্য, সে বিষয়টি মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীদের বোঝানোর চেষ্টা করছি।

তিনি বলেন, মালয়েশিয়া বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের একটি সম্ভাবনাময় বাজার। মালয়েশিয়াকে আসিয়ান বাণিজ্য অঞ্চলের একটি করিডোর হিসেবে ব্যবহার করে আসিয়ানভুক্ত অন্যান্য দেশে বাংলাদেশী পণ্যের রফতানি বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। শুল্কের বিষয়টি নিয়ে দূতাবাস কাজ করছে।