Logo

মুখ ফেরাচ্ছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা

মুখ ফেরাচ্ছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা

শেয়ারবাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিদেশিদের নিট বিনিয়োগ প্রত্যাহার করা হয়েছে প্রায় হাজার কোটি টাকা, যা বিগত এক দশকের ইতিহাসে বিরল। সেই সঙ্গে বিদেশিরা লেনদেনও কমিয়ে দিয়েছেন আশঙ্কাজনকহারে।

হঠাৎ করে বিদেশিদের বিনিয়োগ কমে যাওয়া ভালো লক্ষণ নয় বলে মনে করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা। কমে আসার কারণ হিসেবে তারা বলছেন, ব্যাংকের ঋণ আমানত অনুপাত (এডিআর) কমে যাওয়ার ঘোষণা বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। এছাড়াও ২০১০ সালে বাজার ধস-পরবর্তীতে যেসব সংস্কারের কথা ছিল, সেগুলো না হওয়া বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার অন্যতম কারণ।

পুঁজিবাজার সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ছয় মাসে দেশের দুই শেয়ার বাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ১ হাজার ১ কোটি ৭১ লাখ টাকা নিট বিনিয়োগ প্রত্যাহার করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রত্যাহার হয়েছে মে মাসে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) থেকে মে মাসে বিনিয়োগ প্রত্যাহার হয়েছে ২৮২ কোটি টাকা। আর চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) থেকে ৮৭ কোটি টাকা। ডিএসইর সূত্র মতে, চলতি বছর জুন মাসে উভয় শেয়ারবাজার থেকে ২৭১ কোটি টাকা। জুলাই মাসে বিদেশি পোর্টফোলিওতে নিট বিনিয়োগ কমেছে ১৩২ কোটি ৭১ লাখ টাকা।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছরের প্রথম থেকেই বিদেশি পোর্টফোলিওতে নিট বিনিয়োগ কমার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। জানুয়ারিতেই শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ ২০০ কোটি টাকা কমেছে। পরের মাসে ১৮৬ কোটি টাকা। তবে মার্চ মাসে বিদেশি পোর্টফোলিওতে নিট বিনিয়োগ বেড়েছিল ১৫৭ কোটি টাকা। কারণ সেই সময় ডিএসইর কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে চীনা কনসোর্টিয়ামের আগমনের সংবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা একটু বাজারমুখী হয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

বিগত ১০ বছরের বিদেশি বিনিয়োগ চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৮ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশিরা শেয়ার কিনেছেন মোট ২০ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে মোট ১৪ হাজার ৭০৫ কোটি টাকার শেয়ার তারা বিক্রি করেছেন। সেই হিসাবে গত ১০ বছরে মোট বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ৫ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা।

জানা যায়, ২০১০ সালের পর বাজার অব্যাহতভাবে নেতিবাচক অবস্থানে থাকে। তবে ২০১৩ সালের পর থেকে বিদেশিরা আগ্রহ দেখাতে থাকেন। ২০১৫ সালে শেয়ার কেনাবেচা শেষে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকায়। ২০১৬ সালে এই প্রবণতা আরও বাড়তে থাকে। সেই বছরে বিদেশি বিনিয়োগের নিট পজিশন দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা। পরের বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালের বিদেশি বিনিয়োগ কমার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। গত বছরে বিনিয়োগ কমেছে ৭৫০ কোটি ২৩ লাখ টাকা।

বিগত ১০ বছরের বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১১ সালে বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহার করেছিল ৮৩১ কোটি টাকা। এটাই ছিল এ যাবৎকালে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ প্রত্যাহার। আর এ বছরের সাত মাসে বিনিয়োগ কমেছে হাজার কোটি টাকার ওপরে।

শেয়ার বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ শেয়ারবাজারের গভীরতা বাড়ায়। তাদের মতে, বিনিয়োগ কমে যাওয়া ভালো লক্ষণ নয়। কারণ বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নিজেদের গুটিয়ে নিলে বাজারে পতন শুরু হয়।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম খোলা কাগজকে বলেন, একটি দেশের শেয়ারবাজারের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিদেশিদের বিনিয়োগ বাজারের গভীরতা বাড়ায়। কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করে বিদেশিরা বিনিয়োগ করেন। এর মধ্যে রয়েছে বাজারের বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, আইন-কানুন এবং কারসাজি করলে তার বিচার কত দ্রুত হয়, এসব বিবেচনায় নিয়ে বিদেশিরা বিনিয়োগ করে থাকেন।

তিনি আরও বলেন, ২০১০ সালের পরে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছিল। তার মধ্যে রয়েছে- বহুজাতিক কোম্পানি তালিকাভুক্তির ব্যাপারে উৎসাহিত করা, মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো থেকে বিদেশি ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনার তথ্য দেওয়া, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পেশাগত তথ্য সেবা ও অনলাইনে সঠিক তথ্য দেওয়াসহ অনেক কিছু। কিন্তু এর বেশিরভাগ সুপারিশই বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে বাজারে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়লেও তা টেকসই হচ্ছে না।