Logo

ভোট হবে মোবাইলে?

ভোট হবে মোবাইলে?

দেশকে ডিজিটাল করার কথা বলছে বর্তমান সরকার। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) যতটুকু আধুনিকায়ন হয়েছে তা আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনেই হয়েছে বলে সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, সহজে মোবাইল ফোনে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা তৈরি করা উচিত।

অন্যদিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ ব্যবস্থা তৈরি করছে নির্বাচন কমিশন। ইসির এ রকম পরিকল্পনার একটি নথি প্রিয়.কমের কাছেও এসেছে। যেখানে মোবাইলে ফোনে ভোট গ্রহণের কর্মপরিকল্পনা তৈরি করার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।

ইসির একাধিক সূত্র বলছে, মোবাইলে ভোট গ্রহণের পরিকল্পনা একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বিষয়টি এখনো কমিশনের সভায় ওঠেনি।

সূত্র আরও বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে প্রথমে মোবাইলের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। এতে মোবাইল ফোনে ভোট দেওয়ার বিষয়টি সফলতা পেলে জাতীয় নির্বাচনে এই পদ্ধতি ব্যবহার হতে পারে।

কাছে আসা ইসির কর্মপরিকল্পনার ওই নথিতে বলা হয়েছে, বর্তমান ভোট প্রদান ব্যবস্থায় দেশের প্রায় ২০ থেকে ৩০ ভাগ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন না। তারা তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। সংখ্যালঘু ও দুর্বল/অসুস্থ ভোটারসহ দেশের আপামর ভোটার যাতে নির্বিঘ্নে  তাদের ভোট প্রদান করতে পারেন, সে লক্ষ্যে অধিকতর যাচাই-বাছাই করে মোবাইল ফোনে ভোট দিতে পারলে একদিকে যেমন সব ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন, তেমনি আর্থিক সাশ্রয়, কেন্দ্র দখল প্রবণতাসহ আরও অনেক সুবিধা তৈরি হবে।

বর্তমান কমিশন নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করতে রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। মোবাইল ফোনে ভোটের বিষয়টি আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত হলে এবং সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হলে দেশের বা দেশের বাইরের যেকোনো নাগরিক ভোট দেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন না বলেও ওই কর্মপরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়।

ইসি সচিবালয়ের সহকারী সচিব, যুগ্ম-সচিব পর্যায়ে একাধিক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে এর সত্যতা জানতে চাওয়া হলে, কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করেননি। 

এ বিষয়ে পক্ষ থেকে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদকে ফোন করা হয় ৭ অক্টোবর (রবিবার)। তবে ফোনটি তখন রিসিভ হয়নি। আজ (৮ অক্টোবর) তিনি দেশের বাইরে চলে যাওয়ায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

সোমবার (৮ অক্টোবর) বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, নির্বাচনি আইনি কাঠামোর ভিত্তিতে পরিকল্পনা হয়। মোবাইল ফোনে ভোট দেওয়ার বিষয়টি বিদ্যমান আইনি কাঠামোর কোথাও নেই। নির্বাচনি আইন সংস্কারের বিষয়ে এ যাবৎ যত কাজ হয়েছে, এর ভেতরে এ রকম কোনো কিছু নেই।

রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা পরিকল্পনা করব আইনি কাঠামোর মধ্যে। আইনি কাঠামোর ভেতরেই আমাদের পরিকল্পনা সীমাবদ্ধ রাখতে হয়।’

ইসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচনি আইন সংস্কারের পরিকল্পনা ছিল কমিশনের। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের আগে তা সম্ভব হচ্ছে না। এ বিষয়ে কমিশনার রফিকুল ইসলাম সম্প্রতি  জানিয়েছিলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনি কাঠামো সংস্কার করা হবে।

আইনি কাঠামো তো সংশোধনও করা যায়, এর জবাবে আজ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আইনি কাঠামো সংশোধন করার আগে কোনো দিনই পরিকল্পনা নেওয়া যায় না।’

মোবাইলে ভোট বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী

জাতিসংঘের অধিবেশন শেষে দেশে ফিরে গণভবনে ৩ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংবাদ সম্মেলনের সময় (সংবাদ সম্মেলনের ৫২ মিনিটের মাথায়) মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার প্রসঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

নির্বাচন কমিশনের যতটুকু পরিবর্তন বা আধুনিকায়ন, তা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হয়েছে মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি মনে করি, বাংলাদেশ এখন জিডিটাল। আপনি যদি মোবাইলে টিপ দিয়ে টাকা পাঠাতে পারেন...। টাকা হচ্ছে সবচেয়ে প্রিয় জিনিস, ভোটটাও আপনার প্রিয় জিনিস। তাহলে ভোটটাই-বা আপনি দিতে পারবেন না কেন। এমন একটা ই (পদ্ধতি) তৈরি করা উচিত, মোবাইল থেকে যেন ভোট দিতে পারেন। তাহলে আর কষ্ট করে (ভোট কেন্দ্রে) যাওয়া লাগবে না।’

এর আগেও একাধিকবার মোবাইলে ফোনে ভোট দেওয়ার কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী।

মোবাইল ভোটে শঙ্কা

মোবাইলে ভোট দেওয়ার বিষয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি প্রিয়.কমকে বলেন, ‘মোবাইল যদি নির্ভরযোগ্য হতো তাহলে তো অন্য দেশও এটা ব্যবহার করত। আমরা গতকালই দেখলাম, মোবাইল ব্যবহার করে জালিয়াতি হচ্ছে। মোবাইল ব্যবহার করে মানুষের কাছে চাঁদা দাবি করছে, একজনের মোবাইল নম্বর আরেকজন ব্যবহার করছে, একজনের তোলা সিম আরেকজন ব্যবহার করছে। কীভাবে যে এটা নির্ভরযোগ্য হবে, আমি এটাই বুঝতে পারি না।’

নির্বাচনকে ডিজিটাল করতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করছে ইসি। এ প্রসঙ্গ টেনে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘তারা যে ইভিএম ব্যবহার করছে, এটা সম্পর্কে মানুষ জানেই না। কোনো রাজনৈতিক দলের কাছে তারা এটা উপস্থাপন করে নাই। তারা এর ডেমোট্রেশন দেয় নাই। ইভিএম সম্পর্কে মানুষের সন্দেহ দূর করুক আগে। তারপর তারা প্রমাণ করুক, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ভোট দিলে কোনো জালিয়াতি হবে না। এরপর এটা ব্যবহারের চিন্তা করুক।’

বদিউল আলম বলেন, ‘মানুষ ব্যালট পেপারে ভোট দিয়েই নিরাপদ বোধ করে না। তারা ভোট দিতে পারে না। আর ইলেকট্রনিক যন্ত্র ব্যবহার করলে কী ধরনের জালিয়াতি হতে পারে এটা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে।’

যেভাবে হবে মোবাইলে ভোট

ওই কর্মপরিকল্পনা নথিতে উল্লেখ আছে, রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে ভোটের জন্য ১০ আঙুলের ছাপ ও চোখের আইরিশ নিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে সংগতি রেখে শুধুমাত্র ভোট প্রদানের জন্য কমিশনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে যেকোনো কোম্পানির সিম ব্যবহার করে ভোটারদের রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করা হবে।

রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পর্কে ওই নথিতে বলা হয়েছে, ইসি সচিবালয় থেকে নির্দেশিত নম্বরে (১২৩) এসএমএস করবেন ভোটাররা। এনআইডি শাখা এর বিপরীতে একটি ডাইলগ বক্স প্রেরণ করবেন (জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, নাম ও জন্ম তারিখ)। ভোটার ডাইলগ বক্স পূরণ করে এনআইডি শাখার নম্বরে এসএমএস প্রদানের পর এনআইডি শাখা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোটারদের একটি রেজিস্ট্রেশন নম্বর প্রদান করবেন। যা ভোটাররা ভোট গ্রহণের দিন ভোট দেওয়ায় ব্যবহার করবেন।

ইসি রেজিস্ট্রেশনের জন্য একটি টাইম লাইন দেবে বলেও এতে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়েছে, টাইম লাইনের মধ্যে যেসব ভোটার রেজিস্ট্রেশন করবেন তাদের নাম বাদ দিয়ে রেজিস্ট্রেশন কর্মকর্তা ভোটকেন্দ্রে ব্যবহারের জন্য ভোটার তালিকা মুদ্রণ করবেন। কোনো কারণে মোবাইলের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সিস্টেম কাজ না করলে রেজিস্ট্রেশন করা ভোটারদের জন্য একটি আলাদা তালিকাও মুদ্রণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ভোটাররা রেজিস্ট্রেশন ও জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর উল্লেখ করে পছন্দের প্রতীকে ভোট দিতে পারবেন ভোটাররা।

কেন্দ্রের ফল এবং সার্ভারের ফল মিলে বিজয়ী প্রার্থী ঘোষণা করা হবে। সে জন্য কেন্দ্র দখলের প্রবণতা থেকে সরে আসবেন প্রার্থীরা বলেও কর্মপরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়।

এতে বলা হয়, সার্ভারটি উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ের হলরুমে থাকবে। এই হলরুমে সব প্রার্থীরা প্রথমে নিজের ভোট দেবেন এবং ভোটের কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান করবেন। উপজেলা নির্বাচন কার্যালয় থেকে বিকেল ৪টার সময় সব প্রার্থীকে তাদের প্রাপ্ত ভোটের একটি কপি দেওয়া হবে।

কেন্দ্রের প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ভোটকেন্দ্রে প্রার্থীদের নিয়োগ করা নির্বাচনি এজেন্টদের কাছে সরাসরি প্রাপ্ত ভোটের ফলাফলের বিবরণী প্রদান করবেন। প্রিজাইডিং কর্মকর্তা কেন্দ্রের ফল রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পৌঁছানোর পর সবার সামনে রিটার্নিং কর্মকর্তা সার্ভারে প্রাপ্ত ফলের সঙ্গে যোগ করে বিজয়ী প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবেন।