Logo

বাঙালির বিশ্বকাপ আবেগের দুটো দোকানেই সাটার আঁটা!

বাঙালির বিশ্বকাপ আবেগের দুটো দোকানেই সাটার আঁটা!

দেশ, রাজনীতি, কূটনীতি, নির্বাচন এসব কিছুকে এক মাসের ছুটিতে পাঠাতে চেয়েছিল বাঙালি! কারণ, সবাই মেতে আছে বিশ্বকাপ নামক এক ফুটবল উৎসবে। যেটা ঠিক শুধু উৎসব নয়। এ এক মহামিলন মেলা। রাশিয়ায় না গিয়ে যার অংশীজন এদেশের ষোল কোটি মানুষ।

শহর থেকে গ্রাম, আট থেকে আশি, ধনী-গরীব, সবাই মিলেমিশে একাকার এই মিলন মেলায়। সবাই ভেসেছেন আবেগের স্রোতে। পুড়েছেন আবেগের বারুদে। বাঙালির সেই আবেগের স্রোত খানিকটা ম্রিয়মান হয়ে পড়েছে এখন। আবেগের বারুদও ‘মেয়াদ উত্তীর্ণ’ সিল মেরে প্যাকেটবন্দী! অথচ বিশ্বকাপের ছুটির মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি! রাশিয়ায় বিশ্বকাপ আছে। গোটা ফুটবল বিশ্ব তাকিয়ে রাশিয়ার দিকে। সেখানে কী ১৫ জুলাই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে। না কী নতুন ইতিহাস লেখা হবে!

 ‘আর্জেন্টিনা নক আউট হয়ে যাওয়ার পর আর্জেন্টাইন সমর্থকদের উদ্দেশে ব্রাজিলের এক সমর্থক যে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন, তার কাউন্টার দিতে গিয়ে এক শিক্ষিত-টেলিভিশন পর্দার পরিচিত মুখ যা লিখেছিলেন, সেটার ওপর চোখ পড়তেই মনে হলো, চোখের দৃষ্টিশক্তি ঠিক আছে তো! নাকি অন্য কিছু দেখছি!’ 

কিন্তু বাঙালি এখন আর ইতিহাস নিয়ে মাথা ঘামাতেই রাজি নয়! বিশ্বকাপের মহামিলন মেলা তার কাছে এখন যেন এক ভাঙা হাট।যেখানে কারো হ্যারি কেন মিট মিট করে জ্বলছে। কেউ সাউথ গেট থেকে বের হওয়ার রাস্তা খুঁজছে। কেউ বিশ বছর পর আবার কাপ জয়ের স্বপ্ন বিকোনোর আশা নিয়ে বসে আছে। কেউ ৫২ বছরের অপেক্ষার পালা শেষে ফুটবলকে বাড়ি ফিরিয়ে নিতে চাইছে। কিন্তু বাঙালির এখন কোন স্বপ্ন নেই। নেই কোন অপেক্ষার প্রহর গোনার কষ্ট। তার যেন সব কিছু শেষ! তার আশা-স্বপ্ন সব কিছু এবার খুব সস্তা দরে বিকিয়ে দিয়ে নিঃস্ব হয়ে এক ধরনের শান্তিতেই আছে। তাদের ঘরে এখন আর নেই কোন ঝগড়া-বিবাদ।

মারামারি-হাতাহাতিও হচ্ছে না। চিৎকার -চেচামেচিও নেই! অথচ রাশিয়ায় বিশ্বকাপ আছে। কেউ না কেউ বিশ্বকাপ জিতবে। কিন্তু বাঙালি এখন খুব নিশ্চিন্তে, শান্তি ঘুমাতে পারছে। আর ঘুম থেকে উঠে আবার আগামী চার বছর পর যে স্বপ্ন বড় হবে, তার বীজ বপন করতে শুরু করবে।

আসলে বিশ্বকাপ নিয়ে এদেশের মানুষের স্বপ্নের দুটো দোকান। একটা ব্রাজিল। অন্যটা আর্জেন্টিনা। কিন্তু দুটো দোকানেই সাটার আঁটা। স্বপ্নের ফেরিওয়ালারা খুব তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে গেছেন। বাঙালির তাই অপেক্ষা চার বছর পর কাতার বিশ্বকাপের। ২০২২ এলে বাঙালি আবার জানান দেবে বিশ্বকাপ মানে কী। সেটা ফেসবুক-টুইটার-ইনস্টাগ্রামে সবাইকে জানানো হবে। হয়তো ততোদিনে আরো নতুন কোন জনমাধ্যম এসে যাবে বিশ্বকাপে সবাইকে আমন্ত্রণ জানানোর।

দেয়ালে হলুদ-নীল-সবুজ রং এখন চটে গেছে! আকাশী –সাদা রঙটাও বড্ড ফিকে হয়ে আছে বাড়ির ছাদে পতাকা ওড়ানো সেটাও খুব সেকেলে হয়ে গেছে। তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে বাঙালি বিশ্বকাপ উপভোগ করে ইন্টারনেট-ফেসবুক-টুইটারে। ওটাই যেন ‘গোল’ বলে চিৎকার করে ওঠার খুব বড় গ্যালারি তাদের। নিজের টাইম লাইন, নিজের ওয়ালকেই তার ফুটবল স্কিল আর দক্ষতার প্রমাণ দেয়ার সেরা মাঠ মনে করছে বাঙালি। সেখানে কত স্প্যানিশ-পর্তুগীজ শব্দের নয়া অনুশীলন আর চর্চা। আর বাঙলা? সেটাও আছে। খেউ-খিস্তিও খুঁজে পাবেন। এবং খুব সস্তায়।

শুধু নিজের মোবাইলের কিছু ডাটা খরচ করে ফেসবুক নামক মুখবইয়ের বন্ধুদের পাতাগুলো উল্টাতে হবে আপনাকে। সেটা আর তেমন কি! কত লোক আগে নিজের বাপ-দাদার জমি বিক্রি করে কাপড় কিনে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকা বানিয়েছেন। উড়িয়েছেন। আর এখন আপনি মোবাইলে বিভিন্ন অফারে পাওয়া কিছু ডাটা কিনে একটু খরচ করবেন। তাতে কার্পণ্য করার কিছু খুঁজে পায়না বাঙালি। রবং রাত জেগে খেলা দেখে নিজের ওয়ালে তার একটা ধারাবিবরণী না দিয়ে ঘুমাতে গেলে অনেকের ঘুম হয় না।

মেসি-নেইমার-রোনালদো-রা ফুটবলটা খেলেন। কিন্তু খেলাটা কী বাঙালি ওদের চেয়ে কম বোঝে! না বরং একটু বেশি বোঝে। সেটা বোঝানোর জন্য হলেও তাকে কিছু না কিছু বলতে হচ্ছে। স্ট্যাটাস দিতে হচ্ছে! না হলে আবার সমাজচ্যুত হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। কী দরকার বাবা সেই ঝুঁকির মধ্যে থাকার। তারচেয়ে কিছু শব্দ খরচ করে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়ে নিজের ফুটবলবোধের স্বীকৃতিটুকু আদায় করে নিয়েই ঘুমাতে যাওয়া ভাল। অন্তত তাতে নিজের মুখ রক্ষা হয়। জানান দেয়া যায়; ‘আমিও তোমাদেরই লোক’।

এই তোমাদেরই লোক মানে হয় ব্রাজিল না হয় আর্জেন্টিনার ঘোরতর সমর্থক। আর্জেন্টিনার হার এদেশে অনেকের কাছে রীতিমত শোক দিবস হয়ে যায়। একইভাবে ব্রাজিল হারলেও মনে হয় এর কাছে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে ইউএস বাংলার বিমান দুর্ঘটনা কোন ঘটনাই নয়! মনে হবে আটলান্টিকে ভয়াবহ কোন বিমান দুর্ঘটনা হয়েছে। যে বিমানে কয়েকশত যাত্রী ছিলেন। যাদের কেউ আর বেঁচে নেই।

সেই শোক বাংলাদেশে বসে বাঙালির পক্ষে সামলে ওঠা কঠিন! হার-জিৎ, শোক-কষ্ট, হাসি-আনন্দের মাঝে এখন আর বাঙালির আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থন আটকে থাকছে না। সেটা রুপ নিয়েছে এক ভয়াবহ বিকৃত মানসিকতার চূড়ান্ত বর্হিপ্রকাশে। বন্ধু যে শব্দবাণ ছুঁড়ে দিচ্ছে বন্ধুর দিকে, তা পড়লে অনেক সময় চোখমুখ লাল হয়ে যেতে পারে। সে সব শব্দ আর যাই হোক শিশুপাঠ্যে জায়গা হবে না। সেই সব স্ট্যাটাসের গায়ে সিনেমার সেন্সর সার্টিফিকেটের মত একটা ‘এ’ মার্কা শব্দ লিখে দেয়া জরুরি। না হলে পড়তে গিয়ে ধাক্কা খেতে পারেন, এটা যে শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য!

আর্জেন্টিনা নক আউট হয়ে যাওয়ার পর আর্জেন্টাইন সমর্থকদের উদ্দেশে ব্রাজিলের এক সমর্থক যে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন, তার কাউন্টার দিতে গিয়ে এক শিক্ষিত-টেলিভিশন পর্দার পরিচিত মুখ যা লিখেছিলেন, সেটার ওপর চোখ পড়তেই মনে হলো, চোখের দৃষ্টিশক্তি ঠিক আছে তো! নাকি অন্য কিছু দেখছি!

ভদ্রলোক মহাবিরক্ত হয়ে নিজের হিতাহিত জ্ঞানটা বোধহয় হারিয়ে ফেলেছিলেন। তা না হলে ‘ব্রাজিল’ শব্দটার প্রথম অক্ষরটা নিয়ে তার সাইজ-টাইজ ধরে টান দিলেন কেন! আর্জেনটাইনদের বত্রিশ বছরের অপেক্ষা আরো চার বছর বেড়ে গেলো। তাহলে বত্রিশের সাথে আরো চার, মানে ছত্রিশ হয়ে গেলো! সেটা যারা বলতে শুরু করলেন তাদের ওপর রাগ-ক্ষোভ উগরে দিতে তিনি সাইজ নিয়ে টান দিলেন।

আবার নেইমারকে আটকতে ফাউল করলেই তিনি যেভাবে মটিতে গড়াগড়ি খেয়েছেন সেটা জনমাধ্যমে যেভাবে ট্রোল হলো, তা নিয়ে যে পরিমাণ নেতিবাচক বিজ্ঞাপন তৈরি হলো, তাতে বাঙালি সৃজনশীলতার স্বীকৃতি আসতেই পারে বিশ্বের কোন বিজ্ঞাপনচিত্র উৎসব থেকে। ফুটবল নিয়ে বাঙালির সৃষ্টিশীলতার ঘাটতি আছে। তা না হলে ফিফা র‌্যাংকিং এ এই দেশটা নামতে নামতে দুইশ-র কাছাকছি চলে যায় কীভাবে! কিন্তু ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করার সময় ‘আমার-ই সেরা’ সেটা বার বার বুঝিয়ে দিতে পারছি আমরা।

আরও একটা জায়গায় বাঙালি অন্যদের চেয়ে হাজার মাইল এগিয়ে থাকবে। নিজের দেশ বিশ্বকাপের বাছাই পর্বে খেলার যোগ্যতাও হারিয়েছে এখন। তাতে কী। অন্যরা ব্যর্থ হলে তার দায়টা একজনের কাঁধে খুব সুন্দরভাবে চাপিয়ে দিতে পারে তারা। আর্জেন্টিনা নক আউট পর্ব পেরুতে পারলো না। দায় কার? কার আবার? লিওনেল মেসির! দোষারোপের সময় বাঙালি চিরকাল বেছে নেয় একটা মুখকে। আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে এবার মেসি।

আবার ব্রাজিল যখন বেলজিয়ামের বাধা টপকাতে না পেরে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিলো, তখন সব দায় ঐ একজনের। তার নাম নেইমার! ফুটবল দলগত একটা খেলা। যেখানে এগারজন ফুটবলার একটা দলে খেলেন। সেটা বেমালুম ভুলে যাই আমরা। আমরা দায় চাপিয়ে দেই একজন মেসি একজন নেইমারের কাঁধে! শুধু ব্যর্থতার ক্ষেত্রে নয়। সাফল্যের কৃতিত্বাধিকারীও আমরা খুঁজে নেই সেই একজনকে। ফুটবল দলবদ্ধ খেলা সেই কথাটা মনে থাকে না আমাদের। বাঙালি সব সময় যেন খন্ডিতদর্শনেই বিশ্বাসী। সেটা ফুটবল মাঠ থেকে রাজনীতির মাঠ, পরিবার থেকে সমাজ, রাষ্ট্র সব জায়গায়ই একই অবস্থা। নায়ক পূজার প্রচণ্ড ঈপ্সা আমাদের।

আসলে বিশ্বকাপ বাঙালি সমাজে এমন এক আড়োলন তৈরি করে যা অন্তত এক মাসের জন্য সবকিছু ভুলিয়ে রাখে। দৈনন্দিন জীবনের অভাব অনাটন, দুঃখ –হতাশা, ঘাত-প্রতিঘাত, ভোট নিয়ে তরজরা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা,সব বিপন্নতা ভুলে থাকার সেরা ঔষুধ বাঙালির কাছে ফুটবল বিশ্বকাপ। কিন্তু সেই কাপ নিয়ে বাকযুদ্ধের চর্চাও এবার একটু আগেভাগে এদেশের বাতাসে মিলিয়ে গেছে। তার একটাই কারণ।

বাঙালি বিশ্বকাপের মহিমা খুঁজে পায় বেশি যে দুটো দলের মধ্যে সেই আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল আগেভাগেই আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে রাশিয়া থেকে দেশে ফিরেছে। বিশ্বকাপ নিয়ে বাঙালির ফুটবল আবেগেও ভাটার টান পড়েছে। মেসি-রোনালদো-নেইমার নেই। বাঙালিরও তাই তারিয়ে তারিয়ে বিশ্বকাপ উপভোগ করার সময় নেই! এবার বিশ্বকাপে তারা স্বর্গীয় আনন্দ খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন মেসি-নেইমার নামক ফুটবলাবতারদের পায়ের জাদুর মাঝে। তারাই যখন নেই, তখন বাঙালির বিশ্বকাপ আর থাকলো কোথায়?

রাশিয়ায় এখন ফরাসি বিপ্লব ঘটুক, আর ইংলিশদের হাত ধরে ফুটবল বাড়ি ফিরুক অথবা বেলজিয়ামের সোনালী প্রজন্ম বিশ্বকাপ ইতিহাসে নতুন কোন অধ্যায় লিখুক কিংবা ক্রোয়েশিয়ার নারী প্রেসিডেন্ট আবেগে পদপদবীর মুখোশটাকে ছুঁড়ে ফেলে ১৫ জুলাই ড্রেসিংরুমে রাকিটেচ-মদ্রিচদের সাথে উদ্দামনৃত্যে মেতে উঠুন, তাতে বাঙালির কি এসে যাবে! তাদের বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেছে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা কাজান থেকে বিদায় নিয়ে দেশে ফেরার বিমানে ওঠার সাথে সাথে।