Logo

বাংলাদেশে মাথাপিছু ঋণ আসলে কত?

বাংলাদেশে মাথাপিছু ঋণ আসলে কত?

বাংলাদেশকে একসময় বলা হতো ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’। এর অর্থ বাংলাদেশকে যত সাহায্যই দেয়া হোক না কেন, সব অতলে হারিয়ে যায়। মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব হেনরি কিসিঞ্জার ১৯৭৪ সালে ঢাকা সফর করে বাংলাদেশ সম্পর্কে এ উক্তি করেছিলেন। তার পর থেকেই ১৯৭০, ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে এ ধরনের উক্তি প্রায়ই শোনা যেত। একুশ শতকে এসে এ ধরনের কথা আর শোনা যায়নি। কারণ ততদিনে পৃথিবীর বহু দেশই তলাবিহীন ঝুড়ি হয়ে গেছে। আর বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর সবচেয়ে বড় তলাবিহীন ঝুড়ি। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ঋণগ্রস্ত দেশ। বলা বাহুল্য, পৃথিবীর সব দেশই এখন তলাবিহীন ঝুড়ি। গত ২৭ নভেম্বর তত্ক্ষণাত্ভাবে প্রাপ্ত nationaldebtclock.org-এর ঘড়িতে দেখা যায়, পৃথিবীর সব দেশ মিলিয়ে সামগ্রিক ঋণ এখন প্রায় ৭৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে সর্বোচ্চ ঋণী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র; পরিমাণ ২১ দশমিক ৩২ ট্রিলিয়ন ডলার। এর পরেই হলো জাপান, যার ঋণের পরিমাণ ৯ দশমিক ৬৪ ট্রিলিয়ন ডলার। এ ঘড়িতে বাংলাদেশের তথ্য নেই। অন্য একটি ঘড়ি https://countrymeters.info অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ন্যাশনাল ডেট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের, পরিমাণ ২২ দশমিক ৬৮১ ট্রিলিয়ন ডলার। হিসাবের কিছুটা তারতম্য দেখা যায়। এ ঘড়িতে বাংলাদেশের ন্যাশনাল ডেট দেখানো হয়েছে ১৮১ বিলিয়ন ডলার, জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৭৬ লাখ ৭২ হাজার। এ অনুযায়ী বাংলাদেশের মাথাপিছু ঋণ ৮০ হাজার ৯৬০ টাকা (১ ডলার = ৭৫ টাকা হারে)। 

সারা বিশ্বের তথাকথিত উন্নত দেশগুলোর ঋণের কথা বিশ শতক পর্যন্ত লুকানো থাকত এবং প্রথম বিশ্ব, দ্বিতীয় বিশ্ব, তৃতীয় বিশ্ব বলে পৃথিবীকে উন্নত ও অনুন্নত বলে চিহ্নিত করা হতো। এটা ঠিক যে, ইউরোপীয় দেশগুলোয় এবং আমেরিকা, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় মানুষের জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত, তাই তাদের উন্নত দেশ বলতে দ্বিধা করার কিছু নেই। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির অব্যাহত উন্নতি ও নাগরিকদের তথ্য জানার অধিকার যখন প্রয়োগ হলো, তখন তাদের ঋণের কথাও বেরিয়ে এল। এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ) ২০০০ সাল থেকে দ্য ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক প্রকাশ করে চলছে, যাতে তারা বিশ্বের প্রতিটি দেশের ভূগোল, রাজনীতি, অর্থনীতিসহ যাবতীয় বিষয়ে তাদের সংগৃহীত তথ্য প্রকাশ করছে। একুশ শতকের দ্বিতীয় দশক নাগাদ আরো একটি বিষয় উঠে আসে তা হলো, একটি দেশের মুদ্রা বিনিময় হার ও সেই দেশের মুদ্রায় ক্রয়ক্ষমতার সমতা। দেখা যায়, বাংলাদেশের ৭৫ টাকায় ১ ডলার বিনিময় হলেও ৭৫ টাকায় বাংলাদেশে যা ক্রয় করা যায়, তা মার্কিন মুলুকে ক্রয় করতে প্রয়োজন হয় ২ দশমিক ৬৪ ডলার। এভাবে টাকার বিনিময়মূল্যে বাংলাদেশে যা জাতীয় উৎপাদন হয়, তা ক্রয়ক্ষমতার সমতায় বেড়ে ২ দশমিক ৬৪ গুণ হয়ে যায়। 

সিআইএ প্রকাশিত ফ্যাক্টবুকে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর নাগাদ মুদ্রা বিনিময় হার অনুযায়ী বাংলাদেশের সামগ্রিক জাতীয় উৎপাদন বা গ্রস ডমেস্টিক প্রডাক্ট (জিডিপি) ছিল ২৬১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বা মাথাপিছু ১ হাজার ৫৯১ ডলার। কিন্তু ২০১৭ সালে পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি (পিপিপি) অনুযায়ী তা হয় ৬৯০ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বা মাথাপিছু ৪ হাজার ২০০ ডলার। সিআইএ প্রকাশিত ফ্যাক্টবুকে অন্যান্য হিসাব মুদ্রা বিনিময় হারে দেখানো হয়েছে, যেমন ডিসেম্বর ২০১৭ নাগাদ বাংলাদেশের পাবলিক ডেট ছিল জিডিপির ৩৩ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থাৎ ৮৬ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার; বৈদেশিক ঋণ ছিল ৫০ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার। এর অর্থ দেশীয় ঋণ ছিল ৩৬ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার। এ বইতে দেখানো বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ধরলে মাথাপিছু ঋণ হয় ৪০ হাজার ৫৭০ টাকা (১ ডলার = ৭৫ টাকা ধরে)। কেবল সিআইএ ফ্যাক্টবুক নয়, অন্য অনেক সূত্র থেকে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ, অভ্যন্তরীণ ঋণসহ সামগ্রিক ঋণের পরিসংখ্যান জানা যায়। যেমন  ২০১৭ সালে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ  tradingeconomics.com /bangladesh/external-debt দেখিয়েছে ২৮ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার। এ ওয়েবসাইটে ২০১৭ সালে বাংলাদেশের জিডিপি দেখানো হয়েছে ২৫০ বিলিয়ন ডলার, জনসংখ্যা ১৬২ মিলিয়ন। অর্থাৎ মাথাপিছু ১ হাজার ৫৪৩ ডলার। গভর্নমেন্ট ডেট জিডিপির ২৭ দশমিক ১ শতাংশ, অর্থাৎ ৬৭ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। এ হিসাবে মাথাপিছু ঋণ হয় ৩১ হাজার ৩৬৬ টাকা।  

আইএমএফ ২০১৩ সালে একটি ডেট সাসটেইনেবিলিটি অ্যানালাইসিস (ডিএসএ) করে। এতে দেখা যায়, জুন ২০১৩ নাগাদ বাংলাদেশের Public and Publicly Guaranteed External Debt-এর পরিমাণ ছিল ২৪ দশমিক ৪১৬ বিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ; বাংলাদেশের পাবলিক ডমেস্টিক ডেটের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ১৯০ বিলিয়ন টাকা, যা জিডিপির ২১ শতাংশ। এই মোট হিসাবে ওই বছর জিডিপি ১০ লাখ ৩৮ হাজার কোটি (সূত্র বাজেট বক্তৃতা)-এর ৩৯ দশমিক ৩ শতাংশ ধরে মোট ঋণ হয় ৪ লাখ ৭ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা, অর্থাৎ মাথাপিছু ২৫ হাজার ৫০০ টাকা। আইএমএফ ২০১৭ সালে আরেকটি ডিএসএ করে, যাতে দেখা যায়, জুন ২০১৭ নাগাদ বাংলাদেশের Public and Publicly Guaranteed External Debt-এর পরিমাণ ছিল ২৬ বিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১৩ শতাংশ; বাংলাদেশের পাবলিক ডমেস্টিক ডেটের পরিমাণ ছিল জিডিপির ২১ দশমিক ৩ শতাংশ, যা রাজস্ব আয় ও প্রাপ্ত বৈদেশিক অনুদানের সমষ্টির ১৯২ শতাংশ। এই মোট হিসাবে ওই বছর জিডিপি ১৯ লাখ ৬১ হাজার ১৭ কোটি (সূত্র বাজেট বক্তৃতা)-এর ৩৪ দশমিক ৩ শতাংশ ধরে ঋণ হয় ৬ লাখ ৭২ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা। এভাবে ২০১৭ সালে আইএমএফের হিসাবে মাথাপিছু ঋণ ছিল ৪১ হাজার ৫২০ টাকা।  

বাংলাদেশের ঋণের অংকের হিসাবে তারতম্যের বিষয়টি সম্যকভাবে বুঝতে হলে ঋণের ধরন ও প্রকরণ একটু জানা দরকার। প্রথমত. পাবলিক ডেট/সভরিন ডেট বলতে বোঝায় সরকার বাইরের কাছে কত পরিমাণ ঋণী। গভর্নমেন্ট ডেট বলতে বোঝায় সরকার ভেতর ও বাইরের কাছে কত পরিমাণ ঋণী। এক্সটর্নাল ডেট বলতে বোঝায় সরকার ও দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বাইরের কাছে কত পরিমাণ ঋণী। ন্যাশনাল ডেট বলতে বোঝায় সরকার ও জনগণ দেশের ভেতরে ও বাইরে কী পরিমাণ ঋণী। এ ব্যাখ্যায় tradingeconomics অনুযায়ী ২০১৭ সাল নাগাদ বাংলাদেশ সরকারের পাবলিক ডেট/সভরিন ডেট ছিল ২৮ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার, গভর্নমেন্ট ডেট ছিল ৬৪ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার। তাহলে সরকারের দেশীয় ঋণ ছিল ৩৬ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার। সিআইএ ফ্যাক্টবুক  অনুযায়ী সরকার ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের এক্সটর্নাল ডেট ছিল ৫০ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার, তাহলে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের এক্সটর্নাল ডেট ছিল ৫০ দশমিক ২৬ - ২৮ দশমিক ৫৭ = ২১ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলার। এভাবে বাংলাদেশের জনগণের দেশের ভেতরে ও বাইরে সাকল্যে ন্যাশনাল ডেট ছিল ৬৪ দশমিক ৮৬ + ২১ দশমিক ৬৯ =  ৮৬ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার।  ১৬২ মিলিয়ন জনসংখ্যা ধরে এ হিসাবে গত বছরের ডিসেম্বর নাগাদ মাথাপিছু ন্যাশনাল ডেট ছিল ৪০ হাজার ৭০ টাকা।   

কিন্তু ৯ জুন দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যসূত্র দিয়ে জানানো হয়, ফেব্রুয়ারি ২০১৮ পর্যন্ত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ঋণ ছিল ৯ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। সিআইএ ফ্যাক্টবুকে প্রাপ্ত বৈদেশিক ঋণ ৫০ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার ৭৫ টাকা বিনিময় হারে এর সঙ্গে যোগ করলে বাংলাদেশের মোট ঋণ হয় ১৩ লাখ ৪২ হাজার ৮০২ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের গোড়ায় বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ দশমিক ২০ কোটি ধরলে এর ফলে মাথাপিছু ঋণ হয় প্রায় ৮৩ হাজার টাকা। আমরা মে ২০০৯ অভ্যন্তরীণ ঋণ ৬ হাজার টাকা ও বৈদেশিক ঋণ ১০ হাজার টাকা, মোট ১৬ হাজার টাকা পেয়েছিলাম (অবস্থানপত্র ১৯ মে ২০০৯, দেশপ্রেমিক মঞ্চ)। অভ্যন্তরীণ ও বিদেশী ঋণ উভয়ই অব্যাহতভাবে বেড়ে চলেছে। দেশের অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঋণসহ যে হারে তা বেড়ে চলছে, তারই বর্ধিত সম্ভাবনা দিয়ে ডেট ক্লকগুলো আমাদের সতর্কবার্তা দিয়ে যাচ্ছে। ঋণনির্ভর পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে পৃথিবী বিপুল ঋণের ভারে ক্রমে ন্যুব্জ হয়ে পড়ছে। সেই ভারের তুলনায় আমাদের ভার অনেক কম হলেও এর লাগামহীনতার ব্যাপারে আমাদের অর্থনীতিও পিছিয়ে নেই। ডেট ক্লকগুলোর সতর্কবার্তায় পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর মানুষ এখন যথেষ্ট উদ্বিগ্ন এবং নানা সংস্কার ব্যবস্থা নিয়ে তারা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। আমাদের অর্থব্যবস্থার চালকদেরকেও তাই পিছিয়ে থাকলে চলবে না, অর্থনীতির এই সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্যকভাবে অনুধাবন করে আমাদেরকেও প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।