Logo

প্রার্থীর নাম প্রস্তাব ঘিরে হাজারও অভিযোগ

প্রার্থীর নাম প্রস্তাব ঘিরে হাজারও অভিযোগ

উপজেলা পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি শেষ হয়েছে। আজ শনিবার গণভবনে দলের স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠকে দলীয় প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করা হবে। এদিকে তৃণমূল থেকে দলীয় প্রার্থীর নাম প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে অভিযোগের পাহাড় জমেছে কেন্দ্রে।

এর মধ্যে রয়েছে- তৃণমূলকে ম্যানেজ করে বা লোক দেখানো ভোটের মাধ্যমে প্রার্থী তালিকা তৈরি, জেলা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণে জনপ্রিয়তা থাকার পরও নাম না পাঠানো, ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত নাম বদলে দেয়া ইত্যাদি।

এ ছাড়া স্বাধীনতাবিরোধীদের পরিবারের সদস্যদের নাম পাঠানোর অভিযোগ তোলা হয়েছে। শুক্রবার পর্যন্ত সহস্রাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। আওয়ামী লীগ সভাতির ধানমণ্ডির রাজনৈতিক কার্যালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি বৃহস্পতিবার শেষ হলেও জমা নেয়ার কাজ চলে শুক্রবার পর্যন্ত। চেয়ারম্যান পদে দুই হাজার ৭৬ এবং ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে তিন হাজার ৪৮৫টি ফরম বিক্রি হয়।

এ খাত থেকে আওয়ামী লীগের আয় হয়েছে পাঁচ কোটি ৮৯ লাখ পাঁচ হাজার টাকা। আজ শনিবার বিকালে গণভবনে দলের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠকে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করবে দলটি। সভায় সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘যেসব অভিযোগ এসেছে, মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠকে তা খতিয়ে দেখা হবে। মনোনয়নের ক্ষেত্রে তৃণমূলের রিপোর্ট ছাড়াও তিনটি সংস্থার সার্ভে রিপোর্ট থাকবে। সেগুলো আমরা মিলিয়ে দেখব। তিনি বলেন, অকারণে ক্ষোভ হলে তো হবে না। জোর করে তো আমরা মনোনয়ন দেব না।’

আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রায় প্রতিটি জেলাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কেন্দ্রে চেয়ারম্যান পদে নাম পাঠিয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা প্রস্তাবিত নামের বিরুদ্ধেও বিস্তর অভিযোগ এসেছে। সশরীরে দফতরে এসে লিখিত ও মৌখিকভাবে অভিযোগ জানিয়েছেন অনেকেই। অনেকেই আবার চিঠির মাধ্যমে অভিযোগ দিয়েছেন।

শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত সহস্রাধিক অভিযোগ দফতরে জমা পড়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে ত্যাগী ও যোগ্যদের বাদ দিয়ে অযোগ্য ও বিতর্কিত এবং নিজেদের পছন্দের কিংবা

আত্মীয়স্বজনকে প্রার্থী হিসেবে কেন্দ্রে নাম পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে।

বুধবার আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে জেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ জমা দিয়েছেন বগুড়ার কাহালু উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মোশফিকুর রহমান কাজল। তার দাবি উপজেলায় বর্ধিত সভা করে তার নামই পাঠানো হয়েছে। কিন্তু তা বাদ দিয়ে আবদুল মান্নানের নাম পাঠিয়েছে জেলা আওয়ামী লীগ।

অভিযোগ জমা দেয়ার পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তৃণমূল থেকে আমার নাম জেলায় পাঠানোর পর কেন্দ্রে এসে দেখি নাম নেই। পরে খবর নিয়ে জানলাম, জেলা আওয়ামী লীগ অন্যজনের নাম পাঠিয়েছে। এখানে স্বজনপ্রীতি হয়েছে। দলের ত্যাগী নেতা হিসেবে আমি মনোনয়নের দাবিদার। মনোনয়ন পাই বা না পাই, কেন্দ্র পর্যন্ত নাম আসবে না কেন?

টাঙ্গাইল সদর উপজেলার মনোনয়নপ্রত্যাশী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. তোফাজ্জল হোসেন খান তোহা অভিযোগ জমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, উপজেলা আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভায় প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য ভোট হয়, সেখানে ২২ ভোট পেয়ে প্রথম হয়েছি আমি। অথচ জোর করে ১৮ ভোট দেখিয়ে তাতে আমার স্বাক্ষর নিয়েছে। জেলা থেকে কেন্দ্রে যে লিস্ট পাঠিয়েছে, সেখানে আমার নাম রাখেনি।’

এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে চেয়ারম্যান পদে প্রস্তাবিত নাম পাঠানোর বিষয়ে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সিলেটের ১১টি উপজেলা থেকে চেয়ারম্যান পদে জেলা আওয়ামী লীগ যে ৫২ জনের নাম কেন্দ্রে পাঠিয়েছে তা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। তালিকায় চিহ্নিত রাজাকারপুত্রসহ পরিবেশ ধ্বংস করে অবৈধ পাথর উত্তোলনকারীদের নামও রয়েছে।

তবে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি শফিকুর রহমান চৌধুরী জানান, জেলা নেতারা প্রতিটি উপজেলার তৃণমূলের সঙ্গে কথা বলেই এটি করেছেন।

তিনি বলেন, যেসব উপজেলায় একক প্রার্থী চূড়ান্ত করতে ঐকমত্যে আসা যায়নি সেখান থেকে একাধিক ব্যক্তির নাম পাঠানো হয়েছে।

এদিকে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী বাছাইয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন বেশ কয়েকজন মনোনয়নপ্রত্যাশী। চেয়ারম্যান মনোনয়ন প্রার্থী আসাদুজ্জামান বাবু, ফজলুর রহমান ও গোলাম মোরশেদের অভিযোগ- প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য তৈরি ভোটার তালিকা ‘ইচ্ছেমতো কাটাছেঁড়া’ করা হয়েছে। এমনকি যে ভোটার তালিকা দেয়া হয় তাতে তাদের মোবাইল নম্বর কিংবা অন্য কোনো নির্দেশনাও ছিল না। এভাবে অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে তালিকা কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এসএম শওকত হোসেন বলেন, অভিযোগ সত্য নয়। বরং শতভাগ স্বচ্ছতার মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে বাছাই প্রক্রিয়া।

নাটকীয়তায় ভরা মনোনয়ন ফরম বিক্রি : উপজেলা পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে তৃণমূল থেকে নাম চেয়েছিল আওয়ামী লীগ। বর্ধিত সভা করে সর্বোচ্চ তিনজন করে প্রার্থীর নাম সুপারিশ করে কেন্দ্রে তালিকা পাঠানোর নির্দেশনা দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছিল জেলা-উপজেলা কমিটিগুলোকে।

প্রথমে তিন পদের (উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান) জন্য নাম চাওয়া হয়। এরপর আবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বলা হয়, আওয়ামী লীগ ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদ উন্মুক্ত রাখবে। তখন শুধু চেয়ারম্যান পদে নাম চাওয়া হয় তৃণমূলের কাছে। ৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এক থেকে তিনজনের এ তালিকা কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল।

এর দু’দিন পরেই আবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে তিন পদের (উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান) জন্যই নাম চাওয়া হয়। দলীয় সূত্রে জানা যায়, দুই ভাইস চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রার্থীর বিষয়ে আইনি বাধ্যবাধকতা ও প্রার্থিতা নিয়ে দ্বন্দ্ব-কোন্দল ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় প্রার্থী বাছাইয়ের আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে আওয়ামী লীগ।

এর আগে সিদ্ধান্ত ছিল, এই দুটি পদের নির্বাচন উন্মুক্ত থাকবে। তবে বেশিরভাগ উপজেলায় এই দুটি পদে অসংখ্য প্রার্থী থাকায় তৃণমূলে সংকট তৈরি হয়। এখানেই শেষ নয়। দলীয় মনোনয়ন ফরম কাদের কাছে বিক্রি করা হবে তা নিয়েও শুরুতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিল আওয়ামী লীগ।

দলের মধ্যে আগে থেকেই সিদ্ধান্ত ছিল, তৃণমূলের পাঠানো তালিকায় যাদের নাম থাকবে, তারাই শুধু দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করতে পারবেন। কিন্তু পরে দেখা যায়, তৃণমূল থেকে পাঠানো নামের তালিকায় বর্তমান চেয়ারম্যান কিংবা জয়লাভে সক্ষম এমন অনেক প্রার্থীর নাম নেই। সেই সঙ্গে তৃণমূল থেকে শত শত অভিযোগের পাহাড় জমতে শুরু করে আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমণ্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে ব্যক্তিগতভাবেও অভিযোগ জানান অনেকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন কেউ কেউ। এ পরিস্থিতিতে দলীয় মনোনয়ন ফরম বিতরণ সবার জন্য ফরম ক্রয় উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।

শেষ দিনে মনোনয়ন ফরম বিক্রি ঘিরে বিশৃঙ্খলা : মনোনয়ন ফরম বিক্রির শেষ দিন বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ধানমণ্ডির এই কার্যালয়ে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। মনোনয়ন ফরম কেনার জন্য কার্যালয়ের ভেতর ও বাইরে ছিল দীর্ঘ লাইন।

এ কারণে ফরম পেতে হিমশিম খেতে হয়েছে সবাইকে। একই অবস্থা ছিল মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদের আগ্রহী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে। শুক্রবার জমা দেয়ার শেষ দিনেও ভিড় ছিল আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে।

মনোনয়নপ্রত্যাশীদের অনেকেই অভিযোগ করেন, মনোনয়ন ফরম বিক্রি ও জমা দেয়ার এই কার্যক্রমে নিয়মতান্ত্রিক কোনো পরিবেশ ছিল না। কোন বিভাগের প্রার্থীরা কোথায় কার কাছ থেকে মনোনয়নপত্র কিনবেন বা জমা দেবেন তার কোনো দিকনির্দেশনা ছিল না। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে মনোনয়ন না পাওয়ার অভিযোগ করেন প্রার্থীরা।

ভিড় ও দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকে অসুস্থও হয়ে পড়েন কেউ কেউ। তারা বলেন, আমরা তৃণমূলে রাজনীতি করি। আমাদেরকে শুধু মুখেই দলের মূল চালিকাশক্তি বলা হয়। একমাত্র নেত্রী (আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) ছাড়া আমাদের কষ্ট কেউ বোঝে না। কিন্তু দলের কেন্দ্রীয় অফিসে এসেও আমরা সামান্য সম্মানটুকু পাই না।

এসব অভিযোগের বিষয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তদের বক্তব্য হল- তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সেবার বিষয়টি তারা সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। কিন্তু বড় বড় ইভেন্টে ভিড় সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।