Logo

নিবন্ধনহীন এনজিওর কারণে প্রতারিত গ্রাহক

নিবন্ধনহীন এনজিওর কারণে প্রতারিত গ্রাহক

সম্প্রতি চট্টগ্রামে অর্গানাইজেশন অব সোস্যাল সার্ভিস অ্যান্ড এলিমিনেশন অব পভার্টি (ওসেপ) নামে ক্ষুদ্র ঋণদান ও আমানত সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের প্রায় ৩৫ কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা হওয়ায় বিপাকে আছে বিভিন্ন এনজিও সংস্থা। নগরীর অলিগলিতে গড়ে ওঠা নামসর্বস্ব এনজিওগুলোর নিবন্ধনের ব্যাপারে আছে ধোঁয়াশা। প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তর থেকে আলাদা আলাদা অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। ফলে দেশে কতগুলো এনজিও কাজ করছে, তার সঠিক হিসাব নেই একক কোনো সংস্থার কাছে। সংস্থাগুলোর কার্যক্রমেও তেমন নজরদারি নেই।

সম্প্রতি দেশে বেশ কয়েকটি এনজিওর গ্রাহকের টাকা নিয়ে উধাও হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরের মার্চে নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলায় চলন্তিকা যুব সোসাইটি নামক এনজিও গ্রাহকের প্রায় ৩০ কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়ে গেছে। একই সংগঠন বাগেরহাটের মোংলা থেকে গ্রাহকের ৩ কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়েছে। এর আগে গত বছরের জুনে বান্দরবানে সিসিডিআর নামে একটি বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) প্রায় ১ হাজার ৬০০ গ্রাহকের কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়।

সমবায় অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চট্টগ্রামে সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধিত সংস্থা প্রায় ৬ হাজার ৪০০টি। চট্টগ্রাম জেলা সমবায় অধিদপ্তরের উপরেজিস্টার শেখ কামাল হোসেইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের অফিস থেকে নিবন্ধনের একমাত্র শর্ত হলো প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে সমবায় বা কো-অপারেটিভ শব্দ যুক্ত করতে হবে। এমন প্রতিষ্ঠান আবেদন করলে আমরা জরিপ এবং প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিবন্ধন দিয়ে থাকি। বছর শেষে তাদের বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। কোনো সমবায় সংগঠন গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা করলে আমরা সে ব্যাপারে আইনি পদক্ষেপ নেব। কিন্তু আমাদের নিবন্ধনের বাইরে অন্য প্রতিষ্ঠান হলে তার দায় সমবায় নেবে না। আমাদের আইনে যেটা উল্লেখ করা আছে, তার বাইরে আমরা যেতে পারব না।

এদিকে চট্টগ্রামে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধনকৃত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৬৬৩টি। এসব সংগঠন কোনোভাবেই ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে অংশ নিতে পারে না। কার্যক্রম না থাকায় ২০১২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৮২৮টি সংগঠনের নিবন্ধন বাতিল হয়েছে বলে জানিয়েছেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

চট্টগ্রাম জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যেসব এনজিও বা সংস্থার নিবন্ধন নেই, সেগুলোর বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারব না। ওসেপ নামের সংগঠনটি আমাদের কাছ থেকে কোনো নিবন্ধন নেয়নি। এ কারণে তারা গ্রাহকের টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়ে গেলেও আমরা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারব না। যাদের নিবন্ধন নেই কিন্তু কার্যক্রম চলমান, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে স্থানীয় প্রশাসনকে। আমাদের কিছুই করার নেই।’

এদিকে সমাজকর্মীরা অভিযোগ করেন, ক্ষুদ্রঋণের নামে গ্রাহকের কাছ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নিচ্ছে কোনো কোনো সংস্থা। এসব প্রতিষ্ঠানের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রান্তিক জনগণ। সাধারণত যেসব প্রতিষ্ঠান ক্ষুদ্রঋণের নামে টাকা লেনদেন করে, তারা প্রথমে স্থানীয় পর্যায়ে গ্রাহকদের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনে কাজ করে। তারপর তারা বিভিন্ন স্কিমের মাধ্যমে গ্রাহকদের আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়। একটা সময় পরে তারা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে গ্রাহকদের টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যায় বা বিভিন্ন ঋণের ফাঁদে ফেলে গ্রাহকদের কাছ থেকে উল্টো টাকা আদায় করে। এতে করে প্রকৃত এনজিওগুলো হয়রানির শিকার হচ্ছে। সার্বিকভাবে এই খাতে মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মো. আমিরুল কায়ছার বণিক বার্তাকে বলেন, দেশের সব এনজিওর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে এনজিও ব্যুরো। কোনো এনজিও গ্রাহকের টাকা নিয়ে উধাও হলে তার দায়িত্ব এনজিও ব্যুরোর। কারণ তারা এনজিওগুলোর নিবন্ধন দিয়ে থাকে। তারা যেহেতু জেলা প্রশাসনের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা করেনি, তাই আমাদের সরাসরি দায় থাকে না। তবে কোনো এনজিও গ্রাহকের টাকা নিয়ে উধাও হলে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। আমরা সহায়তা করব।

এদিকে চট্টগ্রামে দায়িত্বরত একাধিক এনজিওর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যেসব এনজিও সরকারের নিবন্ধন নিয়ে ক্ষুদ্রঋণসহ অন্যান্য সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ করে, তাদের জন্য এটা অশনিসংকেত। চট্টগ্রামে ওসেপের সাম্প্রতিক কার্যক্রমের জন্য আমরাও বিব্রত অবস্থায় পড়েছি। অনেক গ্রাহক আমাদের কাছে এসে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে আমরা যতদূর সম্ভব বোঝানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে এনজিওগুলো মনিটরিং করা না হলে চরম বিশৃঙ্খলা নেমে আসবে। এজন্য দেশে ভুয়া বা নিবন্ধনহীন এনজিওর তালিকা তৈরি করে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, নিবন্ধিত এনজিওগুলোর সামগ্রিক কার্যক্রম সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত নয় নিবন্ধনদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। এ অবস্থায় নিবন্ধনহীন এনজিওগুলোর কার্যক্রম তো হিসাবের বাইরে। দেশের এনজিও খাতে বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে হলে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া অতি জরুরি। তাছাড়া জেলা পর্যায়ে এনজিও ব্যুরোর অফিস হলে এ খাতে অনেক সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে করছেন তারা।