Logo

জাতীয় নির্বাচনে ব্যবহার হবে ‘না’ ৩৮০০ কোটি টাকার ইভিএম

জাতীয় নির্বাচনে ব্যবহার হবে ‘না’ ৩৮০০ কোটি টাকার ইভিএম

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচনি আইন সংস্কারের পরিকল্পনা ছিল নির্বাচন কমিশনের (ইসি)। সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এলেও হঠাৎ করে একাদশ নির্বাচনের আগে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংস্কারের মাধ্যমে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) যুক্ত করে ইসি। কমিশন বাগিয়ে নেয় তিন হাজার ৮২৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকার ইভিএম কেনার প্রকল্প। কিন্তু এত টাকায় কেনা ইভিএম জাতীয় নির্বাচনে ব্যবহার হচ্ছে না!

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে ব্যাপক তোড়জোড় ছিল ইসির। কিন্তু প্রকল্প পাস হওয়ার পর তা স্তিমিত হয়ে পড়েছে। ইভিএম নিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রমেও ভাটা পড়েছে। 

জাতীয় অর্থনৈতিক নির্বাহী পরিষদে (একনেক) ১৮ সেপ্টেম্বর দেড় লাখ ইভিএম কিনতে তিন হাজার ৮২৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকার ‘নির্বাচন ব্যবস্থায় অধিকতর স্বচ্ছতা আনয়নের লক্ষ্যে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ক্রয়, সংরক্ষণ ও ব্যবহার’ প্রকল্প অনুমোদন হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে।

কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দশম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় ২০১৪ সালের ২৯ জানুয়ারি। ফলে ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই হিসাবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৪ সালের ২৮ জানুয়ারির মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে তিন মাস আগে তফসিল ঘোষণা হবে ২০২৩ সালের অক্টোবরের শেষের দিকে। কিন্তু দেড় লাখ ইভিএম প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যক্রম শেষ হবে ২০২৩ সালের জুনে। ফলে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিন হাজার ৮২৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকায় কেনা ইভিএম ব্যবহার হচ্ছে না। 

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই এই ইভিএম ব্যবহারের কথা বলেছিল ইসি। কিন্তু এ নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়। কমিশন ইভিএম সংযুক্ত করে আরপিও সংশোধনের প্রস্তাব করলেও এর বর্তমান অবস্থা জানে না এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। আইনি বৈধতা পেলেও একাদশ নির্বাচনে কমিশনে থাকা ইভিএম ব্যবহার হতে পারে কিংবা প্রকল্পের আওতায় কেনা ইভিএম ‘খু-উ-ব, খুব অল্প’ পরিসরে জাতীয় নির্বাচনে ব্যবহার হতে পারে।

কমিশনার রফিকুল ইসলাম ২৭ সেপ্টেম্বর বলেন, ‘আইনি কাঠামো হলে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে খু-উ-ব, খুব অল্প পরিসরে ইভিএম ব্যবহার করা হবে।’

ইভিএম বিষয়ে কমিশন সংশ্লিষ্টদের নিয়ে কর্মশালা ও প্রশিক্ষণের আয়োজনও করেছে। তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই এই কার্যক্রম চলছে, এমনটা মনে করাটা ভুল বলেও জানান রফিকুল ইসলাম।

এর আগে ২৫ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করবে কি, করবে না–এখনো এ রকম সিদ্ধান্ত নেয়নি। আরওপিও সংশোধন হলে নির্বাচন কমিশন তখন একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। যদি এই সংসদ নির্বাচনে নাও হয়, আমাদের তো অনেক স্থানীয় সরকার নির্বাচন আছে। যেখানে আমরা এগুলো ব্যবহার করতে পারি।’

আরপিও সংশোধনীর বিষয়টি এখন কোন পর্যায়ে আছে তাও জানেন না ইসি সচিব।

জাতীয় নির্বাচনে এসব ইভিএম ব্যবহার না হলেও স্থানীয় নির্বাচনে ব্যবহার করতে চায় কমিশন। অথচ প্রত্যেকটি স্থানীয় নির্বাচনের জন্য আলাদা আলাদা ইভিএম কেনার প্রকল্প রয়েছে কমিশনের।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, জাতীয় নির্বাচনের পর ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি নির্বাচন এবং চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে প্রায় ২৩ হাজার ইভিএম কেনা হবে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৩০ হাজার ইভিএম, পৌরসভা নির্বাচনে ৩৫ হাজার, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিন লাখ ১৮ হাজার ৫০০ ইভিএম এবং প্রথম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৫২ হাজার ৫০০ ইভিএম কেনার কথা ভাবছে কমিশন।

কমিশনার রফিকুল ইসলাম জানান, সময়ের স্বল্পতার কারণে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে আরপিও বাদে অন্য নির্বাচনি আইনগুলো সংস্কার করা সম্ভব না হলেও নির্বাচনের পর তা করা হবে।

বর্তমানে বেশ কিছু ইভিএম মেশিন রয়েছে নির্বাচন কমিশনের। অন্যদিকে ইসিও বলছে, আইনি বৈধ্যতা পেলে জাতীয় নির্বাচনে স্বল্প পরিসরে ইভিএম ব্যবহার করবে। এ ক্ষেত্রে কমিশনে বর্তমানে থাকা ইভিএম মেশিন ব্যবহার করা হবে, নাকি নতুন প্রকল্পের ইভিএম ব্যবহার করা হবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনে যে ইভিএম আছে, নতুন ও পুরাতন ইভিএমের মধ্যে যদি কোনো তফাৎ না থাকে, যদিও এগুলো এখনো আমরা জানি না বা একই হতে পারে। একই যদি হয়, তাহলে নতুন ইভিএম ব্যবহার করা আর পুরাতন ইভিএম ব্যবহার করা তো একই জিনিস।’

অন্যদিকে ইভিএম বিষয়ে সচেতনতা কার্যক্রমও একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে ঝিমিয়ে আসছে।

আরপিওতে ইভিএম সংযোজন এবং ইভিএম কেনার প্রকল্প পাস হওয়ার আগে দেশের জনগণের মাঝে ইভিএম বিষয়ে সচেতনা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ঢাকাসহ ১০টি আঞ্চলিক এলাকায় ইভিএম প্রদর্শনীর কথা বলে আসছিল নির্বাচন কমিশন। কিন্তু প্রকল্প পাস হওয়ার পর এখন সেই তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। ঢাকায় কেন্দ্রীয়ভাবে ইভিএম প্রদর্শনীর তৎপরতা থাকলেও আঞ্চলিক প্রদর্শনীর কোনো উদ্যোগ নেই।

এ বিষয়ে এনআইডি উইংয়ের অপারেশন্স প্লানিং ফর এনহেন্স অ্যান্ড কমিউনিকেশনের ইনচার্জ এসএম মাহমুদ আরাফাত বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের ১০টি অঞ্চলে মেলা হওয়ার প্রস্তাবনা ছিল। এটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ আপাতত দেখা যাচ্ছে না। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ১০টি অঞ্চলে ইভিএম প্রদর্শনী কঠিন হবে। তবে ঢাকায় মূল অনুষ্ঠান, এটা হবেই।’