Logo

জনতা ব্যাংক থেকে পে-অর্ডার, আরপিজিসির কোটি টাকা লোপাট

জনতা ব্যাংক থেকে পে-অর্ডার, আরপিজিসির কোটি টাকা লোপাট

সরকারি প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি (আরপিজিসি) লিমিটেডের অ্যাকাউন্ট থেকে এক দিনে প্রায় কোটি টাকা গায়েব হয়ে গেছে। কোম্পানির খিলক্ষেতের জনতা ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে আশরাফ হোসেন নামের এক কর্মচারী তিনটি পে-অর্ডারের মাধ্যমে এ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এ ঘটনায় আশরাফ হোসেনকে আসামি করে নগরীর খিলক্ষেত থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। গঠন করা হয়েছে ৬ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি। কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) গোলাম কিবরিয়া চৌধুরীকে আহ্বায়ক করা হয়েছে কমিটির। অপর সদস্যরা হলেন- মহাব্যবস্থাপক হাসানুজ্জামান, উপ-মহাব্যবস্থাপক (নিরীক্ষা) প্রমোদ রঞ্জন রায়, উপ-মহাব্যবস্থাপক (সংস্থাপন) ফরিদ আহমেদ, মহাব্যবস্থাপক (এইচআর) বুরহানুদ্দিন ও ব্যবস্থাপক (বোর্ড অব শেয়ার) মাসুদ রানা ফেরদৌস। নগরীর খিলক্ষেত থানায় দায়ের করা মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে- জনতা ব্যাংকের পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) শাখার একাধিক কর্মকর্তার যোগসাজশে এই অর্থ লোপাটের ঘটনা ঘটেছে। আসামিরা কোম্পানির অর্থ লেনদেনের জন্য মনোনীত দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল-জালিয়াতি করে এ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। খিলক্ষেত থানার পুলিশ বলেছে তারা গত ২১ ফেব্রুয়ারি মামলাটি রেকর্ড করেছেন, যার নম্বর নং-৪১। দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪০৮, ৪২০, ৪৬৫, ৪৬৮ ও ৩৪ ধারায় এ মামলা করা হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে আরপিজিসিএলের যে দুই শীর্ষ কর্মকর্তার স্বাক্ষরে এ টাকা লোপাট হয়েছে তাদের ও ব্যাংকের যারা এই পে-অর্ডার তৈরি করেছেন তাদের মামলায় আসামি করা হয়নি। আরপিজিসিএলের ওই দুই শীর্ষ কর্মকর্তা হলেন কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মো. বাবর আলী ও ব্যবস্থাপক (বিল ও রেভিনিউ) মো. নজমুল হক মুরাদ। এদিকে ঘটনাটি জানাজানি হলে মন্ত্রণালয় ও কোম্পানিজুড়ে তোলপাড় উঠে। তবে সোমবার এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পুলিশ মামলার মূল আসামি আশরাফ হোসেনসহ কাউকে গ্রেফতার কিংবা আটক করতে পারেনি। এ ঘটনায় ব্যাংক ও কোম্পানির কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়নি। এখনও বহাল তবিয়তে আছেন আরপিজিসিএলের দুই শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্ট থেকে বড় অংকের কোনো অর্থ ছাড় করার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে বিষয়টি টেলিফোনে অবহিত করতে হবে। টেলিফোনে সম্মতি পাওয়া গেলেই কেবল অর্থ ছাড় করা যাবে। চেকের স্বাক্ষর মিলে গেলে বা টাকা হস্তান্তরের বিষয়ে শুধু অফিসিয়াল চিঠির ভিত্তিতে টাকা দেয়া যাবে না। এমনকি অফিসিয়াল চিঠির ভিত্তিতে টেলিফোন করা ছাড়া কোনো পে-অর্ডার বা ব্যাংক ড্রাফটও করা যাবে না। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তারা রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির অফিসিয়াল চিঠির ভিত্তিতে আসামি আশরাফ হেসেনকে ৩ দফায় ৩০ লাখ টাকা করে মোট ৯০ লাখ টাকা দিয়ে দেয়। ব্যাংকের সহকারী মহাব্যবস্থাপককে দেয়া কোম্পানির ওই পৃথক ৩টি চিঠিতে বলা হয়েছে- আপনাদের ব্যাংকের সঙ্গে রক্ষিত আমাদের এসটিডি হিসাব নং-০১৪৮০০৪০০০৫০৯-কে ডেবিট করে লারসের কর্পোরেশন, এইচকে ইন্টারন্যাশনাল ও ইনফোসিস টেকনোলজির নামে ৩০ লাখ টাকা করে মোট ৯০ লাখ টাকার ৩টি পে-অর্ডার/ডিডি প্রস্তুত করে পত্র বাহকের নিকট হস্তান্তরের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হল। পত্রবাহক আশরাফ হোসেনের নমুনা স্বাক্ষর নিম্নে সত্যায়িত করে দেয়া হল। বর্ণিত পে-অর্ডার প্রস্তত করতে যে ব্যাংক চার্জ হবে তা আমাদের অ্যাকাউন্ট হতে ডেবিট করে নেয়ার ক্ষমতা প্রদান করা হল। চিঠিতে স্বাক্ষর করেন মহাব্যবস্থাপক অর্থ ও মহাব্যবস্থাপক প্রশাসন। গ্রাহকের নমুনা স্বাক্ষরেও স্বাক্ষর করেন এই দুই শীর্ষ কর্মকর্তা। আরপিজিসিএলের তদন্ত কমিটি সংশ্লিষ্ট এক শীর্ষ কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, পুরো ঘটনার সঙ্গে ব্যাংক ও কোম্পানির লোকজন জড়িত রয়েছে। এ কারণে এত বিশাল অংকের টাকা ছাড় করার আগে কাউকে জানানো হয়নি। দীর্ঘদিন এ অর্থ ছাড়ের ঘটনা কেউ জানতেন না। হিসাব শাখার কর্মকর্তারা ডিসেম্বর ২০১৮ মাসের লেনদেন যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে এ তথ্য জানতে পারেন। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে জানানো হয় এবং টাকা স্থানান্তরের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। এরপর জনতা ব্যাংক থেকে ৩টি পৃথক ব্যাংক আদেশনামার ফটোকপি পাঠানো হয়। তাতে দেখা যায়, কোম্পানির দুই শীর্ষ কর্মকর্তার স্বাক্ষর রয়েছে। পেট্রোবাংলার অধীন কোম্পানি আরপিজিসিএলের অফিস নগরীর খিলক্ষেতের পাশেই। সরকারি এ কোম্পানিটির আর্থিক লেনদেন, তার পাশেই জনতা ব্যাংকের পল্লী বিদ্যুৎ শাখায় হয়ে থাকে। জানা গেছে, গত ৯ ডিসেম্বর ৩০ লাখ টাকার তিনটি পে-অর্ডার হস্তান্তরের জন্য আলাদা সম্মতিপত্র আসে ব্যাংকে। তাতে সই ছিল অর্থ আর প্রশাসন বিভাগের জিএমের। সেই চেক নিয়ে আসেন কোম্পানির আউট সোর্সড জনবল সরবরাহকারী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স ঢাকা লজিস্টিক অ্যান্ড সলিউশনের অ্যাটেটডেন্ট কর্মকর্তা আশরাফ হোসেন। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে ব্যাংক কর্মকর্তারা কোনোরকম টেলিফোন না করেই ৯০ লাখ টাকা একদিনে ছাড় করেন। লারসেন কর্পোরেশন, এএইচ ইন্টারন্যাশনাল আর ইনফোসিস টেকনোলজি, এ তিন প্রতিষ্ঠানের নামে ৯০ লাখ টাকা স্থানান্তরের এ ঘটনাটি প্রায় আড়াই মাস ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিল আলপিজিসিএল। বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে পর্যন্ত জানানো হয়নি। অবশেষে গত ২১ ফেব্রুয়ারি মামলা দায়ের ও মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি অবহিত করে তারা। এরপর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের নির্দেশে গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, ৯০ লাখ টাকা গায়েব হয়ে গেল বিষয়টি এতদিন আরপিজিসিএল ধামাচাপা দিয়ে রেখেছে? টাকা দেয়ার সময় ব্যাংক থেকে গ্রাহককে একবারের জন্যও ফোন দেয়নি- বিষয়টি সন্দেহের। তিনি বলেন, ব্যাংক এবং কোম্পানি এ লোপাটের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। আগে কোম্পানি এটা নিজেরাই বের করার চেষ্টা করেছে। তারা ব্যর্থ হয়ে পেট্রোবাংলাকে জানিয়েছে। পেট্রোবাংলা থেকে মন্ত্রণালয়ে এসেছে। আরপিজিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামান গমাধ্যমকে বলেন, বিষয়টি তিনি জানেন। এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ২৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তদন্ত কমিটিকে রিপোর্ট প্রদানের জন্য বলা হয়েছিল। প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলেও তিনি জানান। এ বিষয়ে জানতে সোমবার রাতে আরপিজিসিএলের ব্যাংক আদেশনামায় স্বাক্ষরকারী দুই কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, এ স্বাক্ষর তাদের না। তাদের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে এ আদেশনামা তৈরি করা হয়েছে। এ বিষয়ে ব্যাংক থেকে তাদের কাছে কোনো ধরনের কোয়ারি করা হয়নি।