Logo

কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্পায়নে গুরুত্বারোপ: বাণিজ্য মেলার উদ্বোধনে রাষ্ট্রপতি

কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্পায়নে গুরুত্বারোপ: বাণিজ্য মেলার উদ্বোধনে রাষ্ট্রপতি

উন্নত দেশ গড়তে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্পায়নের ওপর অধিকতর গুরুত্বারোপ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। তিনি ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের বলেছেন, প্রতিবছর হাজার হাজার ছেলেমেয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়ে বের হচ্ছে। এসব মেধাবী তরুণকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা খুবই জরুরি।

এজন্য বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকার ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, এসব অঞ্চলের কার্যক্রম শুরুর জন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। তুলনামূলক বেশি সুবিধা ও স্থানীয় সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠায় ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা এগিয়ে এলেই দেশে কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়বে।

বুধবার ২৪তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। এ সময় বাণিজ্য সচিব মফিজুল ইসলাম, এফবিসিসিআই সভাপতি মো. সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন ও রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান বিজয় ভট্টাচার্য্য প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

রাষ্ট্রপতি সরকারের সুযোগ-সুবিধা ব্যবসায়ীদের কাজে লাগানোরও পরামর্শ দিয়ে বলেন, ব্যবসা করা সরকারের কাজ নয়। ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সহযোগিতা করাই সরকারের কাজ। সরকার অবকাঠামো উন্নয়নসহ সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।

আবদুল হামিদ বলেন, সমুদ্রভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের সামনে এনে দিতে পারে উন্নয়নের নতুন দিগন্ত। আমি ব্লু ইকোনমি বা সমুদ্র অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।

রাষ্ট্রপতি স্বাধীনতার ৪৮ বছরের চালচিত্র তুলে ধরে বলেন, স্বাধীনতার পর গুটিকয়েক পণ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে রফতানি পণ্যের বাজার অনেক বিস্তৃত। বর্তমানে ৭৫০টি পণ্য বিশ্বের ২০২টি বাজারে রফতানি হচ্ছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪৪ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আমাদের অবস্থান আরও সুসংহত হবে বলেও বিশ্বাস করি।

২০২১ সাল নাগাদ আমরা মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবার লক্ষ্যে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি জানিয়ে রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, তখন স্বল্পোন্নত দেশসমূহের জন্য প্রবর্তিত অগ্রাধিকারমূলক বাজার প্রবেশাধিকারের সুযোগ আমাদের থাকবে না। তাছাড়া বিভিন্ন শুল্ক ও অশুল্ক বাধাগুলোও অতিক্রম করার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।

শ্রমঘন আইসিটি খাতকে শুধু দেশের উন্নয়নের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা না করে আইসিটিসংশ্লিষ্ট সেবা খাতের রফতানি বাড়াতে উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্রপতি বলেন, এর মাধ্যমে আমরা সীমিত পণ্যের ওপর রফতানিনির্ভরতা দূর করে রফতানি খাতকে সুদৃঢ় অবস্থানের ওপর দাঁড় করাতে সক্ষম হব ইনশাআল্লাহ।

অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, এই সরকার যেমন জনবান্ধব, তেমনই ব্যবসাবান্ধব। তাই মানুষের জীবনমান ও দেশের উন্নয়নে প্রতিনিয়ত ১২-১৪ ঘণ্টা বিরামহীন কাজ করে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ তারই সুফল আমরা পাচ্ছি।

ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নে সরকার সব ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। এর ফলে নতুন নতুন বাজার সৃষ্টি, পণ্য বহুমুখীকরণের উদ্যোগ দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। এ সময় তিনি পোশাক খাতে শ্রম অসন্তোষের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টিকারী কিছু গোষ্ঠী শ্রমিকদের নিয়ে খেলছে। আপনারা সেদিকে খেয়াল রাখবেন, সতর্ক থাকবেন। আমরাও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।

এফবিসিসিআই সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, আমরা দেশের ধারাবাহিক উন্নতির জন্য স্থিতিশীল রাজনীতি, নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা এবং নীতির স্থিতিশীলতা চাই। বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্যে সম্প্রসারণে ৫ থেকে ১০ বছরের স্থিতিশীল নীতি থাকা দরকার। এর পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের পর্যাপ্ত নিশ্চয়তা এবং আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় থাকলে আমাদের আর পেছনে তাকাতে হবে না।

এই মেলা ৮ ফেব্রুয়ারি শেষ হবে। মেলার গেট ও বিভিন্ন স্টল প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। প্রাপ্ত বয়স্কদের প্রবেশের টিকিট মূল্য ৩০ টাকা এবং অপ্রাপ্ত বয়স্কদের ২০ টাকা। মেলায় প্যাভিলিয়ন, মিনি-প্যাভিলিয়ন, রেস্তোরা ও স্টলের সংখ্যা ৬০৫টি।

এর মধ্যে রয়েছে প্যাভিলিয়ন ১১০টি, মিনি-প্যাভিলিয়ন ৮৩টি ও রেস্তোরাঁসহ অন্যান্য স্টল ৪১২টি। এবার বাংলাদেশ ছাড়াও ২৫টি দেশের ৫২টি প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ নিচ্ছে। দেশগুলো হল- থাইল্যান্ড, ইরান, তুরস্ক, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, নেপাল, চীন, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তান, হংকং, সিঙ্গাপুর, মরিশাস, দক্ষিণ কোরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও জাপান প্রভৃতি। মেলা বিকালেই উন্মুক্ত হয়।

যমুনা ইলেক্ট্রনিক্স প্যাভিলিয়নে বিশেষ ছাড়

মেলার প্রথম দিনেও স্টল নির্মাণ ও অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার কাজ চলছে। এখনও অনেক কাজ বাকি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সব গুছিয়ে উঠতে কয়েক দিন সময় লাগবে।

এবারও বাণিজ্য মেলায় যমুনা ইলেক্ট্রনিক্স প্যাভিলিয়ন নিয়েছে। যেখানে দেশীয় ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে ফ্রিজ, টিভি, এয়ারকন্ডিশনসহ যাবতীয় হোম অ্যাপলায়েন্স পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিটির সঙ্গে আকর্ষণীয় অফার রয়েছে। যমুনা ইলেকট্রনিক্সের প্যাভিলিয়ন ইনচার্জ সত্যজিৎ রায়  বলেন, প্রতিবারের মতো এবারও যমুনা ইলেকট্রনিক্স বাণিজ্য মেলায় ক্রেতাদের বিশেষ ছাড় দিচ্ছে। সব ধরনের ইলেকট্রনিক্স পণ্যে ডিসকাউন্ট থাকছে।

এছাড়া প্রতি ১০ হাজার টাকার কেনাকাটায় ১ হাজার টাকার ক্যাশ ভাউচার দেয়া হচ্ছে। এ ভাউচার ব্যবহার করে পরবর্তীতে যমুনা ইলেকট্রনিক্সের পণ্য কিনলে ছাড় পাবেন ক্রেতারা। অন্যদিকে প্রতি হাজার টাকার কেনাকাটায় ১০০ টাকার গিফট ভাউচার দেয়া হচ্ছে। এই ভাউচার যমুনা ফিউচার পার্কের কার্নিভাল, ব্লকবাস্টার সিনেমাস, প্লোয়ার্স ক্লাব, কিডস ওয়ার্ল্ডে ব্যবহার করা যাবে। তিনি বলেন, যমুনা ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল কিনলে ক্রেতাদের রেজিস্ট্রেশন করে দেয়া হবে। বিশ্বমানের এলইডি টিভিতে ছাড় থাকছে।

মেলা আয়োজক কমিটির সদস্যরা বলেন, অন্য বছরের তুলনায় এ বছর ব্যবস্থাপনায় আমরা এগিয়ে রয়েছি। সব প্রস্তুতি শেষের দিকে। দু-একদিনের মধ্যেই মেলা জমে উঠবে। প্রথম দিন বুধবার মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা গেছে, শতাধিক স্টলের কাজ বাকি রয়েছে। বেশ কয়েকটি নামি-দামি প্রতিষ্ঠান সব প্রস্তুতি শেষ করে পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। অনেক স্টলে বেচাকেনাও শুরু হয়েছে। অনেক স্টলে তাদের কর্মীদের পণ্য সাজাতে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়।

স্টল ও প্যাভিলিয়ন সাজসজ্জায় তুলনামূলক বিদেশি স্টল ও প্যাভিলিয়নগুলো পিছিয়ে রয়েছে। এসব প্যাভিলিয়নের মধ্যে পাকিস্তান, ভারত ও ইরানের প্যাভিলিয়ন অন্যতম। কথা হয় উত্তরা থেকে মেলায় আসা সোহেল রহমানের সঙ্গে। তিনি  বলেন, বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে এসেছি। আরও কয়েকবার আসা হবে। পুরোপুরি জমে ওঠার পর মেলা ঘুরে আরও আনন্দ পাওয়া যাবে। মেলায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্টলের পাশাপাশি থাকছে বঙ্গবন্ধু প্যাভিলিয়ন, মা ও শিশু কেন্দ্র, শিশুপার্ক, ইকোপার্ক, সংরক্ষিত নারী স্টল, মসজিদ, গাড়ির পার্কিং, মাদার কেয়ার সেন্টার ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রয়েছে এবারের মেলায়।