Logo

এসএমপি বিধিমালা আরোপে বিটিআরসি ক্ষতির দিকগুলো চিন্তা করেছে কি?

এসএমপি বিধিমালা আরোপে বিটিআরসি ক্ষতির দিকগুলো চিন্তা করেছে কি?

শেয়ারবাজারে একমাত্র সেলুলার বা মোবাইল টেলিফোন কোম্পানি হলো গ্রামীণফোন। এ কোম্পানি ২০০৯ সালে আইপিও বিক্রির মাধ্যমে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত হয়েছে। যেদিন এ কোম্পানি ডিএসইতে তালিকাভুক্ত হয়, সেদিন এক বিরাট উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ করা গেছে। অনেক শেয়ার বিনিয়োগকারী, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের কর্মকর্তা ও সংবাদ মাধ্যমের লোকেরা উপস্থিত থেকে এ কোম্পানির প্রথম ট্রেডিংকে হাততালি দিয়ে স্বাগত জানিয়েছিল। দেশের অর্থনীতিতে আরো চারটি (তত্কালীন) মোবাইল অপারেটর ব্যবসা পরিচালনা করলেও এখন পর্যন্ত কোনো অপারেটরই শেয়ারবাজারে এসে তাদের মালিকানার অতটুকুও দেশের জনগণের কাছে বিক্রয় করেনি। গ্রামীণফোন ছিল একমাত্র কোম্পানি, যারা তাদের ব্যবসার মুনাফার একটা অংশ শেয়ার বিক্রয়ের মাধ্যমে এ দেশের জনগণকে দিয়েছে এবং সেটি দেয়ার জন্য তাদের বেশি কিছু বলতে হয়নি। অনেকটা স্ব-উদ্যোগে সেই মালিকানা দিয়েছে। গ্রামীণফোন ডিএসইতে তালিকাভুক্তির কারণে শুধু যে এ দেশের বিনিয়োগ-কাঙ্ক্ষিত জনগণ ওই কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করার সুযোগ পেয়েছে, তা-ই নয়; ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের শেয়ারবাজারের গভীরতাও বেড়েছে। অন্য বহুজাতিক কোম্পানিকে বাজারে আনার জন্য অনেক অনুরোধ করা হলেও কোনো কাজ হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে তারা একচেটিয়া ব্যবসা করে যাচ্ছে, কিন্তু দেশের জনগণকে কোনো রকমের মালিকানা না দিয়েই। এটা এ দেশেই সম্ভব হচ্ছে। অন্য দেশে সম্ভব হয়নি। এ দেশে কেন তাদের শেয়ারবাজারে আনা গেল না, সে প্রশ্ন আমরা অনেকবারই তুলেছি। আমার মতো লোক হাজারো প্রবন্ধ লিখলেও কোনো কাজ হবে না। যত দিন না আমাদের সরকারের উচ্চ মহল থেকে আকাঙ্ক্ষাটা প্রকাশ বা এ লক্ষ্যে একটা নির্দেশনা জারি করা হয়। যেই কোম্পানি শেয়ারবাজারে এসে তাদের ব্যবসায়িক সাফল্য এ দেশের জনগণের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছে, সেই কোম্পানিকে শাস্তি দেয়ার জন্য রেগুলেটর বিটিআরসি অতি উত্কণ্ঠিত হয়ে পড়েছে।

অতি সম্প্রতি রেগুলেটর বিটিআরসি মোবাইল অপারেটরগুলোর ক্ষেত্রে শ্রেণীবিভাগ করে গ্রামীণফোনকে এসএমপি (Significant Market Power) বা কর্তৃত্ববাদী কিংবা তাত্পর্যপূর্ণ অপারেটর হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসএমপি চিহ্নিত করে গ্রামীণফোনের ব্যবসার ওপর যেসব বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, এতে বোঝা যায় রেগুলেটর এ কোম্পানিটি আরো বেশি বিনিয়োগ করুক, সরকারকে আরো বেশি ট্যাক্স দিক এবং এটা দেশের খুদে শেয়ারধারীদের বর্ধিত ডিভিডেন্ড দিক, তারা সেটা চায় না। গ্রামীণফোনকে এসএমপি হিসেবে চিহ্নিত করে এর আয় রেভিনিউ জেনারেশন, বিজ্ঞাপন, নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ জারি করে বলা হয়েছে, তোমাদের মোট টেলিফোন বাজারের ৪০ শতাংশের বেশি নিতে দেয়া হবে না। তোমরা ব্যবসা করো তো এর মধ্যে থেকেই করতে হবে। এটা করার পেছনে যুক্তি হিসেবে রেগুলেটর যেটা জানিয়েছে, তা হলো এ বাজারে আরো বেশি প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করা। অর্থাৎ আমরা যেটা বুঝেছি, তা হলো এসএমপির সীমা বাজার ব্যবসার ৪০ শতাংশ। কোনো মোবাইল অপারেটর এর বেশি বাজার দখল করতে চাইলে তাকে বলা হবে তুমি থামো, অন্যদের অর্থাৎ আমাদের বাজারের বাকি তিনটি অপারেটরকে বেশি ব্যবসা করতে দাও। যেহেতু গ্রামীণফোনের মার্কেট শেয়ার ৪৫ শতাংশ এবং রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ; তাই এ অপারেটরকে হয় ব্যবসা কমাতে হবে নতুবা বিটিআরসি কর্তৃক জারিকৃত বিধিনিষেধের আওতায় পড়তে হবে। সেগুলোর মূল লক্ষ্যই হলো এসএমপি চিহ্নিত মোবাইল অপারেটরের ব্যবসাকে  কঠিন করে ফেলা এবং তাদের অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগ থেকে দূরে রাখা। এ বিধিনিষেধের ক্ষেত্রে আমাদের কিছু প্রশ্ন হলো, এগুলোর মাধ্যমে রেগুলেটর কি দক্ষতাকেই শাস্তি দিচ্ছে না? এসব বিধিনিষেধের ফলে শুধু কি গ্রামীণফোনের বিদেশী বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এ দেশের হাজার হাজার শেয়ার বিনিয়োগকারী কি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না? যেসব কোম্পানি নতুন পণ্য বাজারজাত করে, আরো বেশি বিনিয়োগ করে, গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করে, প্রতিযোগিতায় আসতে চায় না, রেগুলেটর কি এসএমপি চিহ্নিতকরণের নামে তাদের প্রতিযোগিতায় আনতে চায়? এসএমপির অধীনে জারিকৃত বিধিনিষেধগুলো কি প্রতিষ্ঠানকে নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করবে না? এতে কি দেশের অর্থনীতিতে যে ডিজিটালাইজেশন চলছে বা কাঙ্ক্ষিত ডিজিটালাইজেশনের ক্ষতি হবে না? ভবিষ্যতে ফাইভজি নিলামের ক্ষেত্রে এসব বিধিনিষেধ আরোপের কারণে উপযুক্ত মূল্য কি সরকার পাবে? এসব বিধিনিষেধের কারণে গ্রামীণফোন থেকে সরকারের রাজস্ব প্রাপ্তিতে কি স্থবিরতা আসতে পারে না? সারা পৃথিবীতে এমন নজির কি আছে যেসব কোম্পানি নিজেদের দক্ষতাবলে প্রতিযোগিতায় আসতে পারে না, তাদের জন্য অন্য যেসব কোম্পানি ভালো করছে, তাদের ব্যাপারে বিধিনিষেধের মাধ্যমে পেছনে টেনে ধরে অদক্ষতাকে উৎসাহ দিয়ে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রকে সমতল করা? আজ বিটিআরসি যেসব বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, সেগুলো শুধু বৈষম্যমূলক নয়, ওসব বিধিনিষেধের ফলে শেয়ারবাজার যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে বা হচ্ছে, তেমনই এ দেশের অর্থনীতিতে ডিজিটালাইজেশনের যে গতি আমরা আশা করছি, তা-ও বাধাগ্রস্ত হবে। গ্রামীণফোনে বিনিয়োগ সরকারও করেছে। সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) তাদের বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্পে গ্রামীণফোনের (জিপি) লাখ লাখ শেয়ার কিনে রেখেছে। ৩০ হাজার ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী এ মোবাইল টেলিফোন কোম্পানির শেয়ার কিনে এখন শঙ্কার মধ্যে রয়েছেন। বড় হওয়া কি গ্রামীণফোনের অপরাধ? বড় হতে হলে বেশি বিনিয়োগ করতে হয়, ব্যবস্থাপনা দক্ষ হতে হয়, গ্রাহকের আস্থাভাজন হতে হয়। রেগুলেটর নাম্বার পোর্টাবিলিটির আওতায় যে বিধিনিষেধ জারি করেছে, তা হলো এ ফোন গ্রাহক গ্রামীণফোনের নম্বর থেকে অন্য মোবাইল অফারেটরের নেটওয়ার্কে গেলে ৯০ দিন পর্যন্ত পুনরায় ইচ্ছা করলে গ্রামীণফোনে ফেরত আসতে পারবে না। অথচ এটা অন্য মোবাইল অপারেটরের ক্ষেত্রে ৩০ দিন, কেন এ বৈষম্য? যাহোক, আমরা অর্থনীতির ছাত্র। আমাদের বইয়ে পড়ানো হয়েছে এবং এখনো পড়ানো হয় যে, প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করতে হলে সম্ভাব্য প্রতিযোগীর জন্য বাজার উন্মুক্ত করে দিতে হয়। অর্থাৎ অন্য কোনো কোম্পানি বা ফার্ম এ ব্যবসায় আসতে চাইলে তাকেও অনুমতি দিতে হয়। আমরা এটাও জানি, মোবাইল টেলিফোনের বাজার সারা বিশ্বেই এক ধরনের অলিগোপলি বা কয়েকটা কোম্পানির বাজার। এ ধরনের বাজারে শতভাগ প্রতিযোগিতা আনা যায় না। তবে গ্রাহক বা ভোক্তা-স্বার্থে শক্তভাবে রেগুলেট করা হয়। কিন্তু সেই রেগুলেট-বৈষম্য সৃষ্টি করে, বা কোনো কোম্পানিকে এক জায়গায় থামতে বলে করা হয় না। এ ধরনের বাজারে কোনো কোম্পানি বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করলে শাস্তি পেতে হয়। এ ধরনের বাজারে কোনো কোম্পানি এমন ব্যবসায়িক পলিসি নিতে পারবে না, যাতে করে অন্য প্রতিযোগীদের ব্যবসা করতে কষ্ট হয় বা অন্যদের বাজারের বাইরে ঠেলে দেয়া হয়। গ্রামীণফোন কি এমন কিছু করেছে যে অন্য প্রতিযোগীদের তার ফলে ব্যবসা করতে অসুবিধা হচ্ছে? তাহলে যারা বড় হতে চাচ্ছে, যারা সস্তায় গ্রাহকদের সেবা দিতে চাচ্ছে, তাদের ওপর কেন এত বিধিনিষেধ? রেগুলেটর বিটিআরসির এসব বিধিনিষেধের ফলে শেয়ারবাজারের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা প্রায়ই একটা প্রশ্ন করেন, তা হলো তারা কি গ্রামীণফোনের শেয়ার কিনে ভুল করেছেন? অন্য দেশে এসএমপির সীমা হলো ৫০-৫৫ শতাংশ। কিন্তু বিটিআরসি এ বাজারে এসএমপির সীমা নির্ধারণ করল ৪০ শতাংশ। সবাই একটা প্রশ্ন করে, এ এসএমপি সীমা নির্ধারণ কি শুধু গ্রামীণফোনকে উদ্দেশ করে করা হলো?

এরই মধ্যে গ্রামীণফোনের শেয়ারদর ২৫ শতাংশ পড়ে গেছে। এখনো অনেক বিনিয়োগকারী ইতস্তত করছে, তারা জিপির শেয়ার রাখবে কি রাখবে না। জিপি যদি তাদের ব্যবসা বাড়াতে না পারে, তাহলে এ কোম্পানি যা করতে পারে, তা হলো এর সংস্থাপন ব্যয় কমাতে পারে সেটাও কি ভালো হবে? যেখানে আমরা চাচ্ছি দেশের যুবক শ্রেণীর লোক বেশি করে নিয়োগ পাক। সেখানে শুধু রেগুলেটরি বিধিনিষেধের কারণে যদি এ কোম্পানি তাদের কর্মীদের ছাঁটাই করে, তাহলে সেটা কি দেশের জন্য ভালো হবে। অলিগোপলি বাজারে এ ধরনের বৈষম্যমূলক এবং ব্যবসা-নিরোধ বিধিনিষেধ জারি হলে অন্যত্র অ্যামাজন ডটকম বা আলিবাবার  মতো কোম্পানি কিছুতেই উঠে আসতে পারত না। জানি, তুলনাটা অতটা সঠিক হয়নি। তবুও তুলনাটা দিলাম এজন্যই অলিগোপলিতেও সব কোম্পানি সমান ব্যবসা করে না। দু-একটা কোম্পানি বাজারকে ডমিনেট করে। আমাদের দেশের অর্থনীতি থেকে কয়েকটি উদাহরণ দিতে চাই। কসমেটিক-সাবানের বাজারে বহুজাতিক কোম্পানি ইউনিলিভারের হিস্যা কত? কই সেখানে তো কেউ প্রতিযোগিতার নামে ওই কোম্পানির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করছে না। এমনকি জীবন বীমা কোম্পানির বাজারের ক্ষেত্রে বিদেশী কোম্পানি মেটলাইফের হিস্যা কত? ৪৫ শতাংশের উপরে। কই সেখানে তো রেগুলেটর আইডিআরএ বলছে না তোমাদের এই এই অতিরিক্ত বিধিনিষেধের আওতায় আসতে হবে। আমরা অনেক ভুল করছি অন্তত বিদেশী বিনিয়োগ লাভের ক্ষেত্রে। যারা বেশি বেশি বিনিয়োগ করতে চায়, তাদের জন্য আমাদের অর্থনীতিকে খুলে দিন। জিপি যদি ব্যবসা করে বড় হতে চায়, তাদের বড় হতে দিন। এতে শেয়ারবাজার যেমন উপকৃত হবে, সরকারের রাজস্ব আয়ও আরো বাড়বে, অন্য ক্ষেত্রেও সরকার বেশি ট্যাক্স পাবে এবং এ দেশের জনগণ এ কোম্পানির শেয়ার কিনে লাভবান হবে। বিটিআরসিকে বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করব, জিপির ওপর অতিরিক্ত বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়ার জন্য।

 

লেখক: অর্থনীতিবিদ

অনারারি অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়