Logo

একজন স্বপ্নদ্রষ্টা

একজন স্বপ্নদ্রষ্টা

আজ ঝকঝকে রোদ অরলান্ডোতে। আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। মৃদুমন্দ বাতাস। এরকম দিনে দিঘির পাড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে পারি আমি।

এরকম এক সুন্দর দিনে মেজর জেনারেল (অব.) আমজাদ খান চৌধুরী, আমাদের প্রিয় আমজাদ আংকেল অরলান্ডোতে এসেছিলেন। আগে সামনাসামনি দেখিনি তাঁকে। অনেক গল্প শুনেছি তাঁর সম্পর্কে। আমি খানিকটা অজানা ভয়ে ছিলাম কেমন হবেন তিনি? সুদর্শন, লম্বা, গৌরবর্ণের মানুষটির মুখভরা হাসি দেখে মনে হোল অনেক যুগ ধরে তাঁকে চিনি আমি। মনে হোল চির পরিচিত একজন স্বজন।

 ‘‘মাঝে মধ্যে মনে হয় তিনি আছেন। হেঁটে বেড়াচ্ছেন আমাদের বাড়িতে। হয়তো এখনি বলবেন," বাংলাদেশে কবে আসবেন? ডাক্তার সাহেব।" 

মানুষকে আপন করে নেবার ক্ষমতা ছিল তাঁর অতুলনীয়। আমি অরলান্ডোতে বসে দেশের কথা ভাবি, দেশের জন্য কিছু কাজ করার চেষ্টা করি জেনে আমাদের এখানে একটি ছুটি কাঁটাতে চলে এলেন তিনি। সাথে এলেন তাঁর সহধর্মিণী, একজন অপরিসীম গুণান্বিত মানুষ।

অরলান্ডোতে থাকবার সুবাদে আমি অনেক অতিথি আপ্যায়নের সুযোগ পাই। আমার অতিথিদের কাছ থেকে অনেক কিছু জানতে পারি, শিখতে পারি। কিন্তু তিনি হলেন অতুলনীয়।

তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ সাধারণ মানুষ। কখনই নিজেকে অসাধারণ ভাবতেন না তিনি। যে কারো সাথে মিশে যাবার একটা অতুলনীয় ক্ষমতা ছিল তাঁর। সেনাবাহিনীতে কাজ করার সুবাদে তাঁর জীবনে সব কিছুতেই ছিল শৃঙ্খলার ছাপ। একজন সেনাপতির মতো ছিল তাঁর দূরদৃষ্টি এবং পরিমিত ঝুঁকি নেবার সাহস।

আমার মনে আছে, এখানে আসার পরই প্রথম কথা ছিল, "আমাকে একটা গাড়ির বন্দোবস্ত করে দিন।" সবাইকে আপনি করে বলার একটা মজার অভ্যাস ছিল তাঁর। এমনকি নিজের স্ত্রীকেও। গাড়ি ঠিক হোল। তিনি নিজেই গাড়ি চালিয়ে সারা অরলান্ডো ঘুরে বেড়ালেন। সে গাড়ি নিয়ে চলে গেলেন লম্বা ভ্রমণে।

মায়ামি পার হয়ে 'কি ওয়েস্টে' নামে অনেকগুলো দ্বীপে গাড়ি চালিয়ে এসে বললেন, "আপনাদের এ অঙ্গরাজ্যটা বড় সুন্দর। এখানে বার বার আসা যায়।" তিনি কথা রেখেছিলেন। আমাদের পরম সৌভাগ্য তাকে আমরা বেশ কবার অরলান্ডোতে পেয়েছি। আমাদের পরিবারের সবার জন্য সেটি ছিল একটি বিশাল প্রাপ্তি।

অরলান্ডোতে তাঁর প্রথমবার ভ্রমণের সময় তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, " দেশ সম্পর্কে তো বেশ খবর রাখেন। চিন্তা করেন। কিভাবে সময় পান?" আমি হেসে বললাম দেশের খবরের কাগজ পড়ি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খবর পাই। 'ভোরের কাগজ' পড়ি কিনা জিজ্ঞেস করলেন। আমি বললাম আমার একটি প্রিয় পত্রিকা সেটি। দেশের কথা বললেই তাঁর চোখ জ্বলে উঠত। বাংলাদেশ আর 'প্রাণ-আরএফএল' নিয়ে তাঁর স্বপ্ন ছিল অপরিসীম।

সেবার দেশে ফেরার পর আমাকে নৈশভোজে ডাকলেন তিনি। খাবার টেবিলে দেখি বসে আছেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান সাহেব। আমি অবাক হয়ে আমজাদ চাচার দিকে তাকালাম। তিনি মুচকি মুচকি হাসছিলেন। দীর্ঘ দুঘণ্টা কতো কিছু নিয়ে কথা বললাম আমরা। যে কোন কিছু সম্পর্কে নির্দ্বিধায় কথা বলার একটা অসীম সাহস ছিল তাঁর। আর সেটি থাকতো সৌজন্য আর সন্মান বোধের গণ্ডির মাঝে।

media

কোন রাজনৈতিক আনুকূল্য লাভের আশা করতেন না কখনও তিনি। আর তাই রাজনীতি ছাড়িয়ে দেশের সেরা রাজনীতিবিদদের সাথে একসাথে বসে সত্যি কথা বলতে খুব একটা পিছপা হতেন না দেখেছি। তাঁর সুবাদে দেশের অনেক বাঘা প্রজ্ঞাবান রাজনীতিবিদদের সাথে তাঁর বাসায় সময় কাটাবার সুযোগ পেয়েছি অনেকবার।

দেশের মানুষের ভাগ্য বদলাবার স্বপ্ন ছিল সবসময়। আর তাই একের পর এক স্বপ্ন দেখেছেন তিনি আর সেগুলো সত্যি করেছেন। তাঁর সুযোগ্য পুত্র সানিকে তিনি তুলনা করতেন অলিম্পিকের ক্রীড়াবিদদের সাথে। তাঁর সপ্নের সাথে সানি পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বলে একগাল হাসতেন তিনি।

তাঁর রসবোধ ছিল প্রবল। রাশভারি মেজাজ নিয়ে খুব মজার মজার কথা অবলীলায় বলে যেতেন তিনি। প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন একবার অরলান্ডোতে আসলেন। তিনিও সে সময় এখানে। তাঁর সাথে একসাথে নৈশভোজে যোগ দিলেন তিনি। তাঁকেও খানিকক্ষণ হাসিয়ে ছাড়লেন তিনি।

অনেকের বিয়ের ঘটকালি করতে দেখেছি তাকে আবার ভাঙ্গা বিয়ে জোড়া লাগাতে দেখেছি তাকে। তাঁর কাছে পারিবারিক মূল্যবোধের বিষয়টি ছিল খুব মূল্যবান। জীবনের জটিলতা, কর্মব্যস্ততার পাশে অবকাশ যাপনকে বেশ গুরুত্ব দিতেন তিনি। তিনি বিশ্বাস করতেন জীবনে একটি ভারসাম্য থাকা দরকার।

শিশুদের প্রতি তাঁর অপার ভালবাসা আমাদের খুব স্পর্শ করেছে। আমাদের দুই সন্তান ছিল তাঁর ভীষণ ভক্ত। তিনি বলতেন, " শিশুদের তো শিশুদের মতো বড় হতে দিতে হবে। শিশুদের খেলতে দিতে হবে।" আমাদের আপত্তি ছাড়াই তাঁদের প্রথম নিন্টেনডো তিনিই কিনে দিয়েছিলেন। ওদের সাথে কথা বলার সময় তিনি শিশু হয়ে যেতেন। তিনি বলতেন প্রাণ-আরএফএলের প্রতিটি বড় বড় কারখানার পাশে তিনি স্কুল কলেজ বানাবেন। তাদের স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করবেন।

একবার অরলান্ডো থেকে বিশাল প্রমোদতরীতে করে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ ঘুরে আসলেন। ঘটনাবহুল সে ভ্রমণ শেষে আমাকে বললেন, ' ক্যারিবিয়ান দ্বীপগুলোতে আমাদের অনেক কিছু করবার সুযোগ রয়েছে।' তিনি বলতেন আমরা পৃথিবীর সবখানে বাংলাদেশের তৈরি গুণগত পণ্য পৌঁছে দেব। বাংলাদেশের মানুষের দারিদ্র্য ওতেই লাঘব হবে। তাঁর স্বপ্ন ছিল একজন মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যা যা লাগবে তার সবকিছুই তিনি তৈরি করতে পারবেন।

অসীম স্বপ্নচারী এ বড় মানুষটিকে শেষ দেখা দেখতে গিয়েছিলাম ডিউক ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে। তিনি নিশ্চিত ছিলেন সুস্থ হয়ে দেশে যাবার পর তিনি তার হাসপাতালের কাজগুলো গুছিয়ে আনবেন। নাটোরে একটি ব্যতিক্রমধর্মী হাসপাতাল করবার স্বপ্ন ছিল তাঁর। সে স্বপ্ন পূর্ণ হচ্ছে তাঁর।

বাংলাদেশকে ভীষণ ভালবাসতেন এ স্বপ্নদ্রষ্টা। আমাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করেছে তাঁর জীবনযাপন, দৃষ্টিভঙ্গি আর তাঁর দূরদর্শিতা।

মাঝে মধ্যে মনে হয় তিনি আছেন। হেঁটে বেড়াচ্ছেন আমাদের বাড়িতে। হয়তো এখনি বলবেন," বাংলাদেশে কবে আসবেন? ডাক্তার সাহেব।"