Logo

আরো দ্রুততায় কীভাবে বৈশ্বিক দারিদ্র্য কমানো যায়

আরো দ্রুততায় কীভাবে বৈশ্বিক দারিদ্র্য কমানো যায়

দেশভিত্তিক ভিন্নতার ক্ষেত্রে কারণ যা-ই হোক না কেন, দারিদ্র্য হ্রাসে সফলতার জন্য নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অন্যতম প্রধান উপাদান। এমডিজির সময়ে আমাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থাকা উচ্চদারিদ্র্যের দেশগুলো দুর্বল সক্ষমতার দেশগুলোর চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে দারিদ্র্য হ্রাসে সমর্থ হয়েছে। বড় কথা, প্রথমোক্ত দেশগুলো ২০১৫ সাল নাগাদ এমডিজির প্রায় লক্ষ্যই অধিক কার্যকরভাবে অর্জন করেছে। এসডিজি বাস্তবায়নকারী ১৯৩টি দেশের সরকারের জন্য দারিদ্র্য নির্মূল বা বিমোচন এখনো শীর্ষ প্রাধিকার হিসেবে রয়ে গেছে। তবে এমডিজি থেকে বিশ্বসম্প্রদায় শিক্ষা নিয়েছে যে, লক্ষ্যমাত্রা সবসময় অগ্রগতির নিশ্চয়তা দেয় না। এমডিজি যুগের শেষে দারিদ্র্যসীমায় থেকে যাওয়া ৭২৫ মিলিয়ন মানুষের দারিদ্র্য বিমোচন নিশ্চিতে দেশগুলোয় রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে। অন্যথায় দারিদ্র্য অবসানের নতুন নির্ধারিত প্রান্তসময় ছোঁয়া সবসময় অধরা থাকবে

জাতিসংঘ কর্তৃক নির্ধারিত বজায়ক্ষম উন্নয়ন এজেন্ডার (এসডিজি) অভীষ্ট অনুযায়ী বিশ্ব কি ২০৩০ সাল নাগাদ দারিদ্র্য নির্মূল করতে পারবে? জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে আলোচ্য সময় মেয়াদ (ডেড লাইন) পুনরায় নিশ্চিত করেছে। তবে বৈঠকটিতে এ বলে সিদ্ধান্ত টানা হয়েছে যে দারিদ্র্যের কারণ মোকাবেলায় ব্যাপকতর বৈশ্বিক পদক্ষেপ ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন হবে। যেহেতু বিশ্বসম্প্রদায় নতুন নতুন সমাধান খুঁজে বের করে, সেহেতু তাদের জন্য অতীতের শিক্ষা নির্দেশনামূলক বা দৃষ্টান্তমূলক হতে পারে।

কয়েক দশক ধরে বৈশ্বিক উন্নয়ন নীতিতে দারিদ্র্য বিমোচন কেন্দ্রীয় বিষয় বিবেচিত হয়ে আসছে। চলতি বজায়ক্ষম উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) আগে শেষ হওয়া সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এমডিজি) গত ১৫ বছর সময়ে দারিদ্র্যসীমায় (অর্থাৎ দৈনিক ১ দশমিক ৯০ ডলারের কম আয়) বসবাসকারী মানুষের বিপুলাংশ তাত্পর্যজনকভাবে কমেছে। সংশ্লিষ্ট তথ্যানুযায়ী, ২০০০ সালে এমডিজি শুরু হওয়ার সময়ে প্রায় ২৭ শতাংশ থেকে ২০১৭ সালে প্রায় ৯ শতাংশ বৈশ্বিক দারিদ্র্য কমেছে।

প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে মনে হয়, এসডিজির প্রথম কয়েক বছরে দারিদ্র্য বিমোচনের হারও বেশ চমকপ্রদ। ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত আনুমানিক ৮৩ মিলিয়ন লোক অতিদারিদ্র্য থেকে উঠে এসেছে। এটি কম অগ্রগতি নয়। তবে ২০৩০ সাল নাগাদ নির্ধারিত টার্গেট পূরণে আরো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। আলোচ্য টার্গেট পূরণে উল্লিখিত সময়ে প্রায় ১২০ মিলিয়ন মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করতে হবে। সেদিক থেকে বিদ্যমান ইতিবাচক সুফল সত্ত্বেও অগ্রগতির ধারা এখনো সন্তোষজনক নয়। কাজেই দারিদ্র্য বিমোচন প্রক্রিয়া আরো ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন।

সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট জার্নালে লিখিত এক গবেষণা প্রবন্ধে সফল দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি বাস্তবায়নের অনুঘটকগুলো পরীক্ষা করে দেখিয়েছি। বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের এমডিজি যুগের দারিদ্র্যসংক্রান্ত পরিসংখ্যান থেকে আমরা মূল্যায়নের চেষ্টা করেছি নিম্ন আয় দারিদ্র্য বিদ্যমান দেশগুলোর চেয়ে উচ্চমাত্রার আয় দারিদ্র্য (জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর অংশের আয় তুলনামূলক কম হওয়া) বিরাজমান দেশগুলোয় দ্রুততার সঙ্গে দারিদ্র্য কমেছে কিনা। প্রতি ব্যক্তির দৈনিক ১ দশমিক ২৫ ডলার থেকে ২ ডলারের আয়ের প্রান্তসীমা ব্যবহার করে আমরা পেয়েছি দরিদ্র দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে আসা দেশগুলোয় দ্রুততার সঙ্গে দারিদ্র্য হ্রাস পাচ্ছে।

ইতিবাচক হলেও এসব অনুসন্ধান কিন্তু গল্পের কেবল একটি অংশ সম্পর্কেই বলে। বাকি অংশ রয়ে যায় অন্তরালে। অনেক দেশে দারিদ্র্য নির্মূল লক্ষ্য থেকে এখনো বেশ দূরে রয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, বিদ্যমান ধারায় দারিদ্র্য হ্রাস পেলে অনুমান করি যে একযোগে অতিদারিদ্র্য পুরোপুরি নির্মূল করতে হলে মালির (১৯৯০ সালে যেখানে দেশটির ৮৬ শতাংশ জনগোষ্ঠীরই দৈনিক আয় ছিল ১ দশমিক ২৫ ডলারের কম) লাগবে আরো ৩১ বছর। এমনকি একুয়েডরে— ১৯৯০ সালে যেখানে কেবল ৭ শতাংশ জনগোষ্ঠীর আয় ছিল দৈনিক ১ দশমিক ২৫ ডলার— পুরোপুরি দারিদ্র্য নির্মূলের জন্য লাগবে অন্তত আরেকটি দশক।  

আফ্রিকা ও  এশিয়া মহাদেশের দেশগুলোর পার্থক্যসূচক অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট। সেটি হলো, গৃহীত এমডিজি এজেন্ডা সার্বিকভাবে দারিদ্র্য হ্রাস ত্বরান্বিত করলেও উন্নতির মাত্রা দেশভেদে বেশ ভিন্নতর। ১৯৯০ দশকের প্রথম দিকে আফ্রিকা মহাদেশের নাইজেরিয়া, লেসোথো, মাদাগাস্কার ও জাম্বিয়ায় দারিদ্র্যের মাত্রা ছিল এশিয়ার চীন, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার সমরূপ। তবে ২০১৫ সালে এমডিজি বাস্তবায়নের মেয়াদ শেষে এশিয়ার দেশগুলো লক্ষণীয় বা নাটকীয়ভাবে দারিদ্র্যের মাত্রা কমাতে সমর্থ হলেও আফ্রিকার দেশগুলো তা পারেনি।

এ পিছিয়ে থাকা বা বিচ্যুতি (ডাইভারজেন্স) এখনো অব্যাহত রয়েছে। আজকে অতিদারিদ্র্যের ব্যাপকতা সবচেয়ে বেশি আফ্রিকায়। চলতি বছরের বিশ্বব্যাংকের পভার্টি অ্যান্ড শেয়ারড প্রসপারিটি রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বের ২৮টি দরিদ্রতম দেশের ২৭টিই আলোচ্য মহাদেশে এবং প্রতিটিতে দারিদ্র্য হার ৩০ শতাংশের উপরে। প্রকৃতপক্ষে বিদ্যমান হারে দারিদ্র্য হ্রাস অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালেও সাব-সাহারান আফ্রিকার ৩০০ মিলিয়নের অধিক মানুষ দরিদ্র থাকবে।

দারিদ্র্যের ভূগোল স্থানান্তরে অনেক ফ্যাক্টরই ভূমিকা রেখেছে। আফ্রিকা মহাদেশে রাজনৈতিক সংঘাততাড়িত দুর্বল অথনৈতিক কর্মকৃতি, জাতিগত বা নৃগোষ্ঠীগত বিভাজন এবং বহিঃস্থ অভিঘাত দেশগুলোয় দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি অর্থায়নের বিষয়টি অধিক কঠিন করে তুলেছে। তবে সব ছাপিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হতে পারে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা (স্টেট ক্যাপাসিটি)। মোটের ওপর দুর্বল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কখনই কার্যকরভাবে জনকল্যাণ নিশ্চিত ও  সরকারি সেবা প্রদান করতে পারে না। 

অবশ্যই এটি আরেকটি প্রশ্নেরও জন্ম দেয়। সেটি হলো, কোন ফ্যাক্টরগুলো রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা নির্ধারণ করে? সাধারণভাবে রাষ্ট্রগুলো অধিকতর ভালোভাবে কাজ করে তখনই, যখন শাসক অভিজাতদের ক্ষমতা একটি সীমায় বাধা থাকে। কিন্তু প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাও একটি ভূমিকা রাখে। এর উদাহরণ চীন। আফ্রিকার অধিকাংশ নবীন রাষ্ট্রের চেয়ে সামান্য দীর্ঘ আধুনিক রাষ্ট্রসত্তার অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশটি (চীন) তার ভূখণ্ড পরিচালনায় ব্যাপকতর সক্ষমতার উন্নয়ন ঘটিয়েছে। 

তবু দেশভিত্তিক ভিন্নতার ক্ষেত্রে কারণ যা-ই হোক না কেন, দারিদ্র্য হ্রাসে সফলতার জন্য নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অন্যতম প্রধান উপাদান। এমডিজির সময়ে আমাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থাকা উচ্চদারিদ্র্যের দেশগুলো দুর্বল সক্ষমতার দেশগুলোর চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে দারিদ্র্য হ্রাসে সমর্থ হয়েছে। বড় কথা, প্রথমোক্ত দেশগুলো ২০১৫ সাল নাগাদ এমডিজির প্রায় লক্ষ্যই অধিক কার্যকরভাবে অর্জন করেছে।    

এসডিজি বাস্তবায়নকারী ১৯৩টি দেশের সরকারের জন্য দারিদ্র্য নির্মূল বা বিমোচন এখনো শীর্ষ প্রাধিকার হিসেবে রয়ে গেছে। তবে এমডিজি থেকে বিশ্বসম্প্রদায় শিক্ষা নিয়েছে যে, লক্ষ্যমাত্রা সবসময় অগ্রগতির নিশ্চয়তা দেয় না। এমডিজি যুগের শেষে দারিদ্র্যসীমায় থেকে যাওয়া ৭২৫ মিলিয়ন মানুষের দারিদ্র্য বিমোচন নিশ্চিতে দেশগুলোয় রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে। অন্যথায় দারিদ্র্য অবসানের নতুন নির্ধারিত প্রান্তসময় ছোঁয়া সবসময় অধরা থাকবে।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

 

লেখকদ্বয় যথাক্রমে মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অর্থনীতির অধ্যাপক, গ্লোবাল লেবার অর্গানাইজেশনের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ক্লাস্টারের প্রধান ও ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টারের উন্নয়ন অর্থনীতির জ্যেষ্ঠ প্রভাষক

ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির