Logo

আইইবির তদন্ত প্রতিবেদন: কেমিক্যাল গুদাম থেকেই অগ্নিকাণ্ড

আইইবির তদন্ত প্রতিবেদন: কেমিক্যাল গুদাম থেকেই অগ্নিকাণ্ড

ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ ম্যানশনে অগ্নিকাণ্ডের কারণ বের করতে ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন বাংলাদেশের (আইইবি) বিশেষজ্ঞ দলের তদন্ত প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে তুলে দেয়া হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, কেমিক্যালের গুদাম থেকেই আগুন লেগেছে। ২ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেয়া প্রতিবেদনে অগ্নিকাণ্ডের কারণ চিহ্নিত করে পুরান ঢাকাকে নিরাপদ করতে আটটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে অগ্নিকাণ্ডের পর ২৩ ফেব্রুয়ারি তদন্ত কমিটি গঠন করে আইইবি। ছয় সদস্যের কমিটি ২৮ ফেব্রুয়ারি আইইবির সাধারণ সম্পাদকের কাছে প্রতিবেদন পেশ করে।

এ প্রসঙ্গে আইইবির তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব প্রকৌশলী কাজী খায়রুল বাশার বলেন, ‘চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত সম্পর্কে নানা তথ্য পাওয়া গেছে। সবকিছু যাচাই-বাছাই করে আমাদের ধারণা হয়েছে, কেমিক্যাল থেকেই ওয়াহেদ ম্যানশনে অগ্নিকাণ্ড ঘটছে। এর বাইরে অন্য কোনো কারণে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে এমনটা আমাদের মনে হয়নি।’

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, চুড়িহাট্টার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সিসিটিভি ফুটেজ এবং ক্যামেরায় তোলা কিছু ভিডিও চিত্রে আগুন ছড়িয়ে পড়তে দেখে অনেকে দাবি করছেন, আগুনটা বাইরে থেকে শুরু হয়ে ভবনে ছড়িয়েছে।

কিন্তু মসজিদের পাশে সিসিটিভি ফুটেজে বিস্ফোরণের সঙ্গে এয়ার ফ্রেশনারের (বায়ূ বিশুদ্ধিকরণ) ক্যান দেখতে পাওয়া যায়। তাতে আপাত দৃষ্টিতে আগুন ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলা হতে শুরু হয়েছে বলে ধারণা হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ওই ভবনে বিপুল পরিমাণে অতি দাহ্য পদার্থ থাকায় বিস্ফোরণে বাইরের দেয়াল ভেঙে পড়ে এবং অভ্যন্তরীণ দেয়ালের পলেস্তরা খসে পড়ে। তবে ভেতরের দিকে অক্সিজেন কম থাকায় আগুন সেদিকে বাড়তে পারেনি। এজন্য ওয়াহেদ ম্যানশন সংলগ্ন ওয়াহেদ মঞ্জিলের কোন ক্ষতি হয়নি, বরং রাস্তার দিকে আগুন ছড়িয়েছে। ওয়াহেদ ম্যানশনের একতলা সিঁড়িঘরেও তেমন ক্ষতি হয়নি।

ভিন্নধর্মী তথ্য সম্পর্কে আইইবির তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত বিপরীতমুখী নানা তথ্য আসায় ঘটনাস্থলের পরিপূর্ণ ফরেনসিক তদন্ত প্রয়োজন। শুধু চাক্ষুষ পরিদর্শনে যা দৃষ্টিগোচর হয়েছে তাতে ওয়াহেদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলার দেয়ালে কোনো ভি’সাইন বা আওয়ার গ্লাস তৈরি হলেও এখন সেটা অবলোকন করা সম্ভব নয়। কেননা, দ্বিতীয় তলার দেয়াল বিস্ফোরণে ভেঙে পড়েছে, আর ভেতরের দেয়ালের পলেস্তরা খসে পড়েছে।

প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ওয়াহেদ ম্যানশনসংলগ্ন এলাকা পরিদর্শনের সময় ধারণা পাওয়া যায়, আশপাশে ডিপিডিসির বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার ছিল না বলে বিদ্যুৎ বিতরণ লাইনেও শর্টসার্কিটের কোনো আলামত ছিল না। ট্রান্সফরমার যেখানে ছিল তা অক্ষত অবস্থায় ছিল।

বিদ্যুৎ বিতরণ লাইনগুলোও অক্ষত ছিল। প্লাস্টিক দানা নেয়ার জন্য যে পিকআপ ওয়াহেদ ম্যানশনের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল, তা ডিজেল চালিত ছিল। পরিদর্শনকালে ওয়াহেদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলায় বিভিন্ন ধরনের প্রসাধনীসামগ্রীর মজুদের ভস্মীভূত ও প্রায় অক্ষত অবশেষ দেখা যায়। সেগুলোর মধ্যে ছিল- বাদামের তেল, রেড়ির তেল, জলপাইয়ের তেল, এয়ার ফ্রেশনার ও সুগন্ধি।

আট দফা সুপারিশ : ১. আইন ও বিধির অসামঞ্জস্যতা অবসানের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি করা একান্ত প্রয়োজন। ওই কমিটির মাধ্যমে সংস্থাগুলোর সব আইন ও বিধির সমন্বয় সাধন করে নতুন একটি সমন্বিত আইন ও বিধি প্রয়ণন করতে হবে। সংস্থাগুলো নিজ নিজ কার্যপরিধি অনুযায়ী সমন্বিতভাবে কার্যসম্পাদন করবে এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ করবে। আর এ কাজগুলোর সমন্বয় সাধনের জন্য সিটি কর্পোরেশনের মেয়রদ্বয়ের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা যেতে পারে।

অথবা ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এবং রাজউকের ১ হাজার ৫২৮ কিলোমিটার এলাকা পরিচালনা করার জন্য একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা এবং সেই মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের এবং রাজউকের পুরো এলাকা তদারকি ও মনিটরিং এবং সম্পাদনা করা যেতে পারে।

২. পুরান ঢাকার রাস্তাগুলো অত্যন্ত সরু এবং বড় যানবাহন চলাচলের অযোগ্য। ওই এলাকার বাসিন্দাদের পর্যায়ক্রমে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে নতুনভাবে পরিকল্পিত নগরায়ণের পদক্ষেপ নিতে হবে। ৩. কেরানীগঞ্জ বা সাভার এলাকার কেমিক্যাল পল্লী গঠনের মাধ্যমে অনতিবিলম্বে দাহ্য পদার্থের গোডাউন সরানোর ব্যবস্থা করতে হবে ৪. গ্যাস, ইলেকট্রিক, টেলিফোন ও পানির লাইনের জন্য আলাদা আলাদা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা করতে হবে।

৫. পুরান ঢাকার কেমিক্যাল ব্যবসায়ী, গুদামজাতকারী ও পরিবহনে নিয়োজিত সবাইকে কেমিক্যাল ব্যবহার ও সংরক্ষণের ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। কেমিক্যালের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ব্যাপারে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে জনমত গঠনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

৬. বিস্ফোরক দ্রব্যাদির আমদানি, মজুদ. বিতরণ ও ব্যবহারের মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য একটি জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে ৭. ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ৮. রাজউক ও সিটি কর্পোরেশনের আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

ভবনগুলো ধ্বংস নয়, সংস্কার করতে হবে : চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো ধ্বংস নয়, সংস্কার করে ব্যবহার করা সম্ভব বলে জানিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) গঠিত তদন্ত কমিটি। ১১ সদস্যবিশিষ্ট এ কমিটি রোববার ডিএসসিসি মেয়রের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে ভবনটির ডিটেইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট (ডিইএ) করতে হবে। ডিইএ’র রিপোর্ট অনুযায়ী পরের ১৫০ দিনের মধ্যে নতুন করে প্রয়োজনীয় মজবুত রেট্রোফিটিং করতে হবে। এ দুটি সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ভবনটি ব্যবহার করা যাবে না। এছাড়া বাকি চারটি ভবনের সামনের দিকের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ ভেঙে মেরামতের পর ডিএসসিসি ও রাজউকের যথাযথ অনুমোদনের পর ব্যবহার করা যাবে।

এ প্রসঙ্গে তদন্ত কমিটির সদস্য ও ডিএসসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ধ্বংস করা লাগবে না, সংস্কার করে ব্যবহার করা যাবে। তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনে এই সুপারিশ করেছে।’

চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ ম্যানশন ছাড়াও তার পার্শ্ববর্তী চারটি ভবন (হোল্ডিং নং-৬৫, ১৮, ১৭ এবং চুড়িহাট্টা মসজিদ) বাহ্যিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডে ঘটনাস্থলে ৬৭ জন ও পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়।