Logo

অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৯: বাঁধভাঙা জনস্রোত

অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৯: বাঁধভাঙা জনস্রোত

সবাই আশা করেছিলেন এমনটা হবে। তবে প্রাপ্তি তারচেয়ে অনেক বেশি। বইমেলায় শুক্রবার সন্ধ্যায় এমন কোনো স্টল খুঁজে পাওয়া যায়নি যার সামনে পাঠকের ভিড় ছিল না। পাঠক বই কিনছেন অবিরাম।

এতদিন বলা হচ্ছিল শুধু বইয়ের উৎসব, শুক্রবার মনে হল বই কেনারও উৎসব। প্রকাশকরা হেসেছেন প্রাণখোলা হাসি। পাঠকরা বইয়ের পাশাপাশি পেয়েছেন তাদের প্রিয় লেখকদেরও।

কাল ছিল অমর একুশে গ্রন্থমেলার তৃতীয় শুক্রবার। মেলার দ্বার খুলে যায় বেলা ১১টায়। দুপুর ১টা পর্যন্ত ২ ঘণ্টা শিশুপ্রহরে ছিল শিশুদের উচ্ছ্বাস। সকাল থেকেই মেলায় ছিল বইপ্রেমীদের অংশগ্রহণ। বিকালে বাড়ে ভিড়, আর সন্ধ্যায় তা বাঁধভাঙা জনস্রোতে রূপ নেয়।

‘প্রথমা’র প্যাভিলিয়নে একটার পর একটা অটোগ্রাফ দিচ্ছিলেন কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক। বিকালে ‘অন্যপ্রকাশ’র প্যাভিলিয়নে আসেন কথার জাদুকর প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী ও অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন। এমনিতেই সেখানে সব সময় হুমায়ূন আহমেদের বই ঘিরে পাঠকদের চাপ থাকে।

শাওনকে পেয়ে পাঠকদের প্রিয় লেখকের বই কেনার ধুম পড়ে যায়। শাওন অনবরত কয়েক ঘণ্টা একটার পর একটা অটোগ্রাফ দেন। এ সময় তার দু’পাশে ছিলেন দুই ছেলে নিষাদ ও নিনিত। শাওন মেলায় অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশ হওয়া মুনিরা মাহমুদের লেখা গল্পগ্রন্থ ‘বৈশাখী মেঘের কান্না’র মোড়ক উন্মোচন করেন।

অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম  বলেন, তৃতীয় শুক্রবারে পাঠকের অংশগ্রহণ অন্যবারের এ সময়ের চেয়ে বেশি। আগামী দিনগুলোতে এটা অব্যাহত থাকবে। বইয়ের বিক্রিও সন্তোষজনক।

অন্বেষা প্রকাশের স্বত্বাধিকারী শাহাদাৎ হোসেন বলেন, মেলা তার সত্যিকারের চেহারা পেয়েছে আজ। এটা আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে।

এদিন বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে লেখক, গবেষক ও সাংবাদিক ইকবাল খোরশেদ রচিত ‘বাংলার লোক ঐতিহ্য পরিচয়’ গ্রন্থের মোড়ক প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী। সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর কবি মুহাম্মদ সামাদ।

মেলার প্রথম প্রহরে মোড়ক উন্মোচন মঞ্চে লেখক আলী ইদরীসের ‘আমি একাত্তরের কথা বলছি’ বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন কবি বিমল গুহ। বক্তব্য রাখেন কবি-সাংবাদিক শুচি সৈয়দ, গল্পকার মনি হায়দার, লেখক আলী ইদরীস প্রমুখ। সাম্প্রতিক প্রকাশনী থেকে ‘আমি একাত্তরের কথা বলছি’ বইটি আজই মেলায় এসেছে।

মেলার দ্বিতীয় প্রহরের প্রথম বই হিসেবে সাংবাদিক মঈন আবদুল্লাহর ‘সিনেমা হলে তালা’র মোড়ক উন্মোচন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি ও মধুমিতা সিনেমা হলের কর্ণধার ইফতেখারউদ্দিন নওশাদ। উপস্থিত ছিলেন- বাংলানামার সিইও কবীর আলমগীর, সাংবাদিক জনি হকসহ অনেকেই।

ইফতেখারউদ্দিন নওশাদ বলেন, আমার খারাপ লাগছে এ ধরনের একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করতে। কিন্তু এটাই বাস্তবতা! তবে আমরা চাই সিনেমা হলে তালা নয়, সব সিনেমা হল খোলা থাকুক। আমাদের প্রধানমন্ত্রী সংস্কৃতিবান্ধব। আগামীতে নিশ্চয় এমন সুখবর দিতে পারবেন মঈন আবদুল্লাহ, সেই প্রত্যাশা করি।

মঈন আবদুল্লাহ বলেন, দেশের ৩০টির বেশি জেলার সরেজমিন চিত্র তুলে ধরে হয়েছে বইটিতে। এক সময় অনেক সিনেমা হল ছিল, এখন অনেকগুলো বন্ধ হয়ে গেছে, কিছু হল ধুঁকছে। এ বইটিতে পরিসংখ্যানের পাশাপাশি সিনেমা হল বন্ধের কারণও তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। কবীর আলমগীর তার বক্তব্যে বলেন, বইটি প্রকাশ করতে পেরে আমরা গর্বিত। আপনারা পড়ে উপকৃত হলেই আমাদের শ্রম সার্থক হবে।

মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে অবস্থিত লেখক বলছি... মঞ্চে নিজেদের বই নিয়ে পাঠকের মুখোমুখি হয়েছিলেন পাঁচ লেখক। জলতরঙ্গ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ‘পুরান ঢাকার জেল্লা লালবাগ কেল্লা’ নিয়ে কবি আসলাম সানী এবং মানুষ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ‘ঝুলনপূর্ণিমা থেকে নেমে এলো’ নিয়ে কবি গোলাম কিবরিয়া পিনু, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত ‘বাবুদের বাজিমাত’ নিয়ে শিশুসাহিত্যিক পলাশ মাহবুব, বৈভব থেকে প্রকাশিত ‘আজিজুল একটি গোপন নামতা’ বইটি নিয়ে কবি-গল্পকার ফারুক আহমেদ এবং বিদ্যাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত ‘গল্প সমারোহ’ নিয়ে কথা বলেন কথাসাহিত্যিক জুলফিয়া ইসলাম।

নতুন বই : শুক্রবার মেলায় নতুন বই এসেছে ২৭২টি। এর মধ্যে রয়েছে- আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘বঙ্গবন্ধু আজ যদি বেঁচে থাকতেন’ (আগামী), মুস্তাফিজ শফির ‘ব্যক্তিগত রোদ ও অন্যান্য’ (কথাপ্রকাশ), নির্মল সরকারের ‘অটিজমের কিছু মিথ’ (অন্বেষা), জ্যোতির্ময় নন্দীর ভাষান্তরে ‘হ্যাকুনিন ইসশু : শত কবির শত কবিতা’ (খড়িমাটি), আহসান হাবীবের ‘উন্মাদীয় রম্য’ (অর্জন প্রকাশ), বুলবুল সরওয়ারের ‘মমির দেশ মিশর’ (ঐতিহ্য), স্বকৃত নোমানের ‘বাঙালি মনীষীদের ছেলেবেলা’ (অনিন্দ্য প্রকাশ), সুমন্ত আসলামের ‘রাত একটা একুশ : পাঁচ গোয়েন্দা’ (কথা প্রকাশ), আনিসুল হকের ‘বঙ্গবন্ধুর জন্য ভালোবাসা’ (পার্ল পাবলিকেশন্স), লুৎফর হাসানের ‘দুপুর বাড়ি ছড়ার হাঁড়ি’ (পাললিক সৌরভ), ধ্রুব এষের ‘আমার বাঘ মামাই’ (ময়ূরপঙ্খি)।

মারুফুল ইসলামের ‘দহগ্রাম’ (অন্যপ্রকাশ), সঞ্জীব দ্রংয়ের ‘ঈশ্বর সাঁওতালদের ভুলে গেছে’ (সূচিপত্র), আবুল হায়াতের ‘বিষফল’ (প্রিয় বাংলা প্রকাশন), মুস্তফা জামান আব্বাসীর ‘ঢাকা না কলকাতা’ (প্রিয় বাংলা প্রকাশন), সৌমেন সাহার ‘রসায়নের রহস্য’ (অক্ষর প্রকাশনী), মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘টুটনের ঘুম’ (দ্য পপ-অপ ফ্যাক্টরি), হাসান হাফিজের ‘মুক্তিযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ (অক্ষর প্রকাশনী), আলম তালুকদারের ‘দশ ফালি রোদ’ (আদিগ্রন্থ), নির্মলেন্দু গুণের ‘কবিতাকুঞ্জ’ (বিভাস), শ্যামসুন্দর সিকদারের ‘দৃষ্টির ভেতর ঘুমের শরীর’ (জনপ্রিয় প্রকাশনী)।

মেলামঞ্চের আয়োজন : শুক্রবার বিকালে গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী : শ্রদ্ধাঞ্জলি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক বেগম আকতার কামাল। আলোচনায় অংশ নেন কবি মোহাম্মদ সাদিক এবং সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল।

অনুষ্ঠানের সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আকরম হোসেন বলেন, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতা বাংলা কবিতার ভুবনে এক বিশেষ মাত্রা-সংযোজক। অতি সাধারণ বক্তব্য-বিষয়কে তিনি প্রায় আটপৌরে ভঙ্গিতে যেভাবে কবিতা করে তুলেছেন তা সত্যি বিস্ময়কর। এছাড়া কবিতা নিয়ে তার গদ্যও পাঠকের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

সন্ধ্যায় কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ করেন কবি ইকবাল আজিজ ও হারিসুল হক। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী মাসকুর-এ-সাত্তার কল্লোল ও রূপা চক্রবর্তী। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে ঘাসফুল শিশুকিশোর সংগঠন ও ভোরের পাখি নৃত্যকলা কেন্দ্র।