Logo

অজ্ঞাত রোগে ৫ জনের মৃত্যু : বালিয়াডাঙ্গীতে আতঙ্ক, দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা

অজ্ঞাত রোগে ৫ জনের মৃত্যু : বালিয়াডাঙ্গীতে আতঙ্ক, দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা

‘১৫ দিনের মধ্যে একই পরিবারের পাঁচ জন মারা গেলেও রোগ শনাক্ত করতে পারছে না কেউ। রোগের ভয়ে কেউ কেউ গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে চাচ্ছে। কী করব ভেবে পাচ্ছি না।’

কথাগুলো ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার ধনতলা ইউনিয়নের মরিচপাড়া গ্রামের মোশারফ হোসেনের। গত ১৫ দিনে মরিচপাড়া গ্রামের ফজল আলীর পরিবারের পাঁচ সদস্য অজ্ঞাত রোগে নিহত হয়েছেন। অসুস্থ অবস্থায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন ওই পরিবারের আরো তিনজন। এ অবস্থায় এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। মরিচপাড়া, বাউরিভিটা, বন্দরপাড়াসহ আশপাশের গ্রামের সবাই মাস্ক ব্যবহার করছেন। আতঙ্কে দিন পার করছে স্থানীয়রা। স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে এখনো এসব মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করা হয়নি।

ঠাকুরগাঁওয়ের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. শাহাজাহান নেওয়াজ বলেন, কী কারণে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে, তা সঠিকভাবে বলা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা আপাতত এটাকে অজ্ঞাত রোগ বলছি। অজ্ঞাত রোগের লক্ষণের বিষয়ে তিনি বলেন, রোগীরা প্রথমে প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হন। একই সঙ্গে প্রচণ্ড মাথাব্যথা ও গলা বসে যায়।

এ বিষয়ে ঢাকাস্থ রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) থেকে একটি পাঁচ সদস্যের একটি দল গতকাল বিকালে ঠাকুরগাঁও এসেছে। এর আগে দলটি সোমবার থেকে কাজ করেছে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। দলের সদস্যরা ঠাকুরগাঁওয়ে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের এড়িয়ে গেছেন।

বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কর্মকর্তা ফিরোজ জামান জুয়েল জানান, আইইডিসিআর থেকে আসা দলটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে কথা বলছে। তারা নমুনা সংগ্রহ ও রোগ নির্ণয়ের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আগামীকাল দলটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবে। আইইডিসিআর থেকে আসা তদন্ত কমিটির প্রধান হলেন ডা. মো. গাজী শাহ্ আলম। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন ডা. তানজীলা নওরীন, ডা. দেবাশীষ কুমার সাহা, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট শাহানাজ পারভীন ও মিউজিয়াম অ্যাটেনডেন্ট মো. ইসমাইল খান।

মরিচপাড়া গ্রামের রফিকুল ইসলাম ও সাব্বির রহমান বলেন, আমরা খুব আতঙ্কের মধ্যে আছি। জ্বর হলেই চিন্তায় পড়ে যাই ভাইরাস সংক্রমণ হলো কিনা। পরিবার নিয়ে ভয়ে দিন পার করছি। আমরা চাই প্রশাসন যেন কী কারণে মানুষ মারা যাচ্ছে তা নিশ্চিত করে।

এদিকে ভাইরাসের কথা জানিয়ে মরিচপাড়া গ্রামের দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে উপজেলা প্রশাসন।

স্থানীয় ভাণ্ডারদহ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কৃষ্ণ প্রসাদ সিংহ জানান, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমার প্রতিষ্ঠান ও ভাণ্ডারদহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রশাসনের নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত স্কুল দুটি বন্ধ থাকবে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাসুদুর রহমান মাসুদ বলেন, ঢাকা থেকে তদন্ত টিম না আসা পর্যন্ত ও নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত স্কুল দুটি বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে মাস্ক পরে চলাফেরার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিক্যাল অফিসার মনিরুজ্জামান জানান, আমরা স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনামতো ২৪ ঘণ্টা সেবা দিতে প্রস্তুত রয়েছি। রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে যাতে তত্ক্ষণাৎ উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো যায়, সেজন্য অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

জানা গেছে, মরিচপাড়া গ্রামের ফজর আলীর ছেলে আবু তাহের (৫৫) গত ৯ ফেব্রুয়ারি অজ্ঞাত রোগে মারা যান। এরপর ২০ ফেব্রুয়ারি একই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন আবু তাহেরের জামাতা হাবিবুর রহমান (৩৫)। হাবিবুরের মৃত্যুর পরদিন মারা যান আবু তাহেরের স্ত্রী হোসনে আরা (৪৫)। এর দুদিন পর ২৪ ফেব্রুয়ারি অসুস্থ হয়ে পড়েন আবু তাহেরের দুই ছেলে ইউসুফ আলী (৩০) ও মেহেদী হাসান (২৭)। বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পর তাদের রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে ইউসুফ আলী মারা যান। আর ওইদিন রাতেই মারা যান মেহেদী হাসান। এছাড়া অসুস্থ হয়ে এখনো হাসপাতালে ভর্তি আছেন ওই পরিবারের রবিউলসহ তিনজন।

এর আগে সোমবার দুপুরে ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে একটি চিকিৎসক দল ভাণ্ডারদহ মরিচপাড়া গ্রাম পরিদর্শন করে গ্রামবাসীকে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন জানান, এলাকার মানুষদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে সব রকম ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা তাদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছি। আমাদের পক্ষ থেকে ২৪ ঘণ্টা সেবা দিতে স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রস্তুত রয়েছেন।